সহশিরোনাম: অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের যৌথ উদ্যোগে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ, জলবায়ু অর্থায়ন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর আলোচনা; ভূরাজনৈতিক সংকট ও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ার মধ্যে এবার জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে কয়লার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দুই দেশ অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের প্রসার, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে আয়োজক ও নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোর নিজস্ব জ্বালানি বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এই উদ্যোগের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিশ্বের মোট জ্বালানি চাহিদার ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ থেকে পূরণের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি বর্জ্য ও মিথেন গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্ব পাবে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা এবার সহজ হবে না। ইউক্রেন, ইরান ও গাজায় চলমান সংঘাত বৈশ্বিক রাজনৈতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করছে। এর সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ও ডিজিটাল বিশৃঙ্খলার আশঙ্কাও সম্মেলনের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করছে।
দুই দেশের নেতৃত্বে সম্মেলনের কর্মপরিকল্পনা
কপ৩১-এর আয়োজন তুরস্কের আনতালিয়ায় হলেও সম্মেলনের সভাপতিত্ব করছে অস্ট্রেলিয়া। গত বছর ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ৩০-এর শেষ পর্যায়ে হওয়া সমঝোতার ভিত্তিতে দুই দেশ যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ২০২১ সালে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়া ছিল তাঁর সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য।
অন্যদিকে, তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু সম্মেলন আয়োজনের চেষ্টা করে আসছে। দেশটির দাবি, ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ২০২৬ সালের সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো অনুযায়ী, পাঁচটি আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মধ্যে পালাক্রমে সম্মেলনের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে একই গোষ্ঠীর দুটি দেশ দায়িত্ব পেতে চাইলে বিরোধ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট বিধান না থাকায় অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের মধ্যে শুরুতে মতবিরোধ দেখা দেয়। পরে দুই দেশ সম্মেলনের প্রস্তুতিতে একসঙ্গে কাজ শুরু করে।
জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতে রূপান্তর
সম্মেলনের মূল আলোচনা পরিচালনা করবে অস্ট্রেলিয়া। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে কম কার্বন নিঃসরণকারী অর্থনীতিতে রূপান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
জলবায়ু আলোচনায় এই প্রক্রিয়াকে ‘ন্যায্য রূপান্তর’ বলা হয়। এর মাধ্যমে জ্বালানি খাতের পরিবর্তনের পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল, জলবায়ু অর্থায়ন এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর অগ্রগতি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, তুরস্ক পরিচালনা করবে সম্মেলনের কর্মপরিকল্পনা। আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরে বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের স্বেচ্ছামূলক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং মিথেন নিঃসরণ কমানোর বিষয়গুলো সামনে আনা হবে।
বৈশ্বিক রাজনীতি ও জলবায়ু সংকটের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জয় আমাজন বনাঞ্চল সংরক্ষণের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো জয়ী হলে বনাঞ্চলে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের সুযোগ বাড়তে পারত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। খরা, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য দুর্যোগের প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক মূল্যায়নে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে দ্রুত ও ব্যাপকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের প্রসার এবং জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠছে।
কয়লানির্ভর দুই দেশের নেতৃত্বে কপ৩১ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নতুন উদ্যোগের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সম্মেলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থায়ন এবং জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে কার্যকর রূপান্তর কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপরই নির্ভর করবে আলোচনার সাফল্য।

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























