মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকির সন্দেহ, কন্টেইনারে মিলল ২০০৯ মডেলের স্পোর্টস কার ও প্রিমিয়াম সেডানের সামনের অংশ
গাড়ির ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানির ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আনা হয়েছিল একটি কন্টেইনার। কিন্তু কাস্টমসের কায়িক পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে ভিন্ন চিত্র। যন্ত্রাংশের আড়ালে আমদানি করা হয়েছে একটি সম্পূর্ণ বিএমডব্লিউ স্পোর্টস কার, আরেকটি বিলাসবহুল সেডানের সামনের অংশ এবং ইসুজু ব্র্যান্ডের পাঁচটি হাফ-কাট ট্রাক। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে গাড়ি ও এর বিভিন্ন অংশ আমদানির এ ঘটনায় শুল্ক ফাঁকির সম্ভাব্য একটি চক্রের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) চালানটির কায়িক পরীক্ষা করা হয়। চট্টগ্রামের হালিশহরের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এম/এস আয়াজ অটো ইন্টারন্যাশনাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরব জাপান ইউজড কারস অ্যান্ড স্পেয়ার পার্টস কোম্পানি থেকে কন্টেইনারটি আমদানি করে। চালানটি খালাসের দায়িত্বে ছিল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আমিন (সিঅ্যান্ডএফ) প্রাইভেট লিমিটেড।
কাস্টমসের নথিতে চালানটিতে ডিফারেনশিয়াল অ্যাসেম্বলি, পাওয়ার স্টিয়ারিংসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কন্টেইনার খুলে পরীক্ষা করার পর ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে পাওয়া পণ্যের বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়ে।
কায়িক পরীক্ষায় কন্টেইনারের ভেতর থেকে সম্পূর্ণ সিকেডি (কমপ্লিটলি নকড ডাউন) অবস্থায় ২০০৯ মডেলের দুই আসনবিশিষ্ট একটি বিএমডব্লিউ এস-ড্রাইভ ২৩আই স্পোর্টস বা রেসিং কার পাওয়া যায়। গাড়িটির ইঞ্জিন ক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৫০০ সিসি। সাধারণ গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের একটি সম্পূর্ণ গাড়ি আমদানির বিষয়টি কাস্টমসের নজরে আসে।
একই চালানে পাওয়া গেছে ২০১৬ সালের প্রায় ৩ হাজার সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন বিএমডব্লিউ ৭৪০আই মডেলের একটি প্রিমিয়াম সেডানের সামনের অর্ধাংশ বা ফ্রন্ট হাফ-কাট। গাড়িটির বাকি অংশ কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। অন্য কোনো চালানে অংশগুলো আনা হয়েছে কিনা, কিংবা পরবর্তী সময়ে আনার চেষ্টা হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া কন্টেইনারে ইসুজু ব্র্যান্ডের পাঁচটি হাফ-কাট ট্রাক পাওয়া গেছে। এসব ট্রাকের কেবিনের ভেতরে কৌশলে প্যাকেটজাত করে রাখা হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ। ফলে চালানটির প্রকৃত পণ্য ও আমদানির উদ্দেশ্য নিয়ে আরও বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের ধারণা, গাড়ির বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন বা কাটা অবস্থায় একাধিক চালানে আমদানি করে দেশে সেগুলো পুনঃসংযোজনের একটি চক্র সক্রিয় থাকতে পারে। এভাবে পূর্ণাঙ্গ গাড়ি বা তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলাদা চালানে এনে প্রকৃত পণ্যের পরিচয় ও মূল্য গোপন করে শুল্ক-কর ফাঁকির চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে কায়িক পরীক্ষায় পাওয়া পণ্যগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। উদ্ধার হওয়া গাড়ি ও যন্ত্রাংশের ইঞ্জিন নম্বর, চ্যাসিস নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি এসব পণ্যের প্রকৃত শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাস্টমস আইন, ২০২৩ এবং বিদ্যমান আমদানি নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএমডব্লিউ গাড়িটির বাকি অংশের অবস্থান ও চালানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো আমদানি কার্যক্রম রয়েছে কিনা, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির সম্ভাব্য অনিয়ম ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























