বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্পে দেশীয় ব্র্যান্ডের বিকাশ, মানসম্মত পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ এবং ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের এক উল্লেখযোগ্য নাম ফিট এলিগ্যান্স। ২০০১ সালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা শারমিনের নেতৃত্বে ব্র্যান্ডটি এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে ১২টি আউটলেট নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তরার সেন্টারপয়েন্ট শপিং মলে নতুন শোরুম চালুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণযাত্রায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ছোট উদ্যোগ থেকে বিস্তৃত পরিসর
ফিট এলিগ্যান্সের যাত্রা শুরু ২০০১ সালের ২৬ মার্চ। তখন বাংলাদেশের বাজারে মানসম্মত রেডিমেড স্যুটের সুযোগ ছিল সীমিত। বিদেশি ব্র্যান্ডের পোশাকের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এবং স্থানীয় টেইলারিংয়ে ফিটিংয়ের ভিন্নতা থাকায় ক্রেতাদের জন্য মানসম্মত বিকল্প তৈরি করা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতা থেকেই আন্তর্জাতিক মানের ফরমাল পোশাক স্থানীয়ভাবে তৈরি করে তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে সরবরাহের লক্ষ্য নেয় প্রতিষ্ঠানটি। শুরুতে স্যুট, ব্লেজার ও ট্রাউজার ছিল প্রধান পণ্য। সময়ের সঙ্গে ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনায় পণ্যের পরিধি বাড়ানো হয়।
নেতৃত্বে ওয়াহিদা শারমিন
অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে ওয়াহিদা শারমিন ২০০৪ সালে ফিট এলিগ্যান্সে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি ব্যবস্থাপনা ও ব্র্যান্ড সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন।
তার নেতৃত্বে ফিট এলিগ্যান্স শুধু আনুষ্ঠানিক পোশাকের ব্র্যান্ড হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পুরুষদের পোশাকের পাশাপাশি নারীদের ফ্যাশন, এথনিক পোশাক এবং বিভিন্ন লাইফস্টাইল পণ্যেও যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফিমে ও জাদীদ নামে বিশেষ পণ্যধারার মাধ্যমে ক্রেতাদের জন্য বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ওয়াহিদা শারমিনের উদ্যোক্তা পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মেহউইশ ক্লজেট এবং খাদ্যভিত্তিক উদ্যোগ দ্য উইকেন্ড কিচেন। ফলে তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ফ্যাশনের পাশাপাশি অন্যান্য সৃজনশীল ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে।
১২ আউটলেটে সম্প্রসারণ
ফিট এলিগ্যান্সের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম দিক এর খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্কের বিস্তার। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ সিলেট ও চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির মোট ১২টি শোরুম রয়েছে।
১৫ আগস্ট ২০২৬ রাজধানীর উত্তরায় সেন্টারপয়েন্ট শপিং মলে ব্র্যান্ডটির ১২তম আউটলেট উদ্বোধন হয়। নতুন শোরুমে স্যুট, ব্লেজার, ট্রাউজার, শার্ট, ফরমাল ও ক্যাজুয়াল পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।
পণ্যে বৈচিত্র্য, মানে গুরুত্ব
স্যুট, ব্লেজার ও ট্রাউজারের পাশাপাশি ফিট এলিগ্যান্সের সংগ্রহে রয়েছে শার্ট, পাঞ্জাবি, কাবলি, শেরওয়ানি, লেদার জ্যাকেট, টাই, মোজা ও পারফিউম। নারীদের জন্য রয়েছে কুর্তি ও বিশেষ ফ্যাশন কালেকশন।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য রেডিমেড পোশাকের পাশাপাশি কাস্টম-মেড স্যুট তৈরির সুবিধা। ক্রেতারা নিজেদের পছন্দ, মাপ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পোশাক তৈরি করাতে পারেন।
ফিট এলিগ্যান্সের সঙ্গে যুক্ত ইস্ট ওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের রপ্তানিমুখী উৎপাদন অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানটিকে মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক উৎপাদন কৌশল ও দক্ষ কর্মীদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ দেয়।
ক্রেতার আস্থাই সাফল্যের ভিত্তি
ফিট এলিগ্যান্সের ব্যবসায়িক দর্শনে মান, ফিটিং, আরাম ও গ্রাহকসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী কাপড়, হালকা নির্মাণ এবং বিভিন্ন মূল্যস্তরের পোশাকের মাধ্যমে মধ্যবিত্তসহ বিভিন্ন শ্রেণির ক্রেতাকে লক্ষ্য করে পণ্য তৈরি করা হচ্ছে।
২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছিলেন, দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৫০টির বেশি স্যুট এবং বিভিন্ন পোশাক মিলিয়ে ২৭০টির বেশি পণ্য পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই সক্ষমতা বড় অর্ডার সরবরাহ ও মৌসুমি চাহিদা মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটির শক্তি হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড
ফিট এলিগ্যান্সের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে নতুন শহরে সম্প্রসারণ, অনলাইন বিক্রয় শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে ওয়াহিদা শারমিন দেশীয় পরিচয় বজায় রেখে আন্তর্জাতিক মানের লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠানের বিকাশের লক্ষ্য তুলে ধরেন।
ছোট পরিসরের উদ্যোগ থেকে ১২টি আউটলেটে পৌঁছানো ফিট এলিগ্যান্সের যাত্রা বাংলাদেশের ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। মানসম্মত পণ্য, ক্রেতার চাহিদা, উৎপাদন সক্ষমতা ও ধারাবাহিক সম্প্রসারণের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় ফ্যাশনশিল্পে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের পরিচিতি বাড়ানোর স্বপ্নই এখন তার পরবর্তী যাত্রার মূল লক্ষ্য।

নিজস্ব প্রতিবেদক 


















