০২:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬

দেশে ভ্যানিলা চাষের সম্ভাবনা, বিশ্ববাজারে কেজি ৩০ হাজার টাকা

ভ্যানিলা বাগান । এ আই নির্মিত প্রতীকী ছবি।

The gallery was not found!

দেশেই শুরু হয়েছে দামি মসলাপণ্য ভ্যানিলার চাষ। যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা চাষ করছেন উদ্যোক্তারা।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে প্রাকৃতিক ভ্যানিলার প্রতি কেজির দাম প্রায় ২৫০ ডলার বা ৩০ হাজার টাকা। তবে দেশে এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। চাষের সম্ভাবনা যাচাই ও উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা।

বগুড়ায় ২০১৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম। ইন্দোনেশিয়ায় প্রশিক্ষণ শেষে সেখান থেকে ভ্যানিলাগাছের কাটিং এনে তিনি গবেষণা কেন্দ্রে রোপণ করেন। বর্তমানে সেখানে তিন শতক জমিতে ৬০টি ভ্যানিলাগাছ রয়েছে।

ফয়সাল ফাহিম বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে এটি শ্রমঘন ও উচ্চ বিনিয়োগের ফসল। ৫০ শতক জমিতে এক হাজার গাছের বাণিজ্যিক প্রকল্প করতে প্রাথমিকভাবে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কি না, তা যাচাইয়ের পর কৃষকদের কাটিং সরবরাহ করা হবে।

যশোরে ১৫০ গাছ

যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের স্বর্পরাজপুর গ্রামের উদ্যোক্তা মো. সারোয়ার হোসেন আম ও ড্রাগন চাষের পাশাপাশি ভ্যানিলা চাষ করছেন। ছায়াবৃত্ত ক্যানোপি পদ্ধতিতে চার বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে কিছু গাছ মারা গেলেও বর্তমানে তাঁর বাগানে প্রায় ১৫০টি ভ্যানিলাগাছ বেড়ে উঠছে।

সারোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ভ্যানিলা চাষের উপযোগী জায়গার অভাব নেই। ১০০ কৃষককে প্রয়োজনীয় কাটিং দেওয়া হলে চার-পাঁচ বছর পর এক হাজার কেজি ভ্যানিলা বিন রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করবেন।

ফল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

ভ্যানিলা অর্কিডজাতীয় লতানো গাছের ফল। চারা রোপণের দুই থেকে তিন বছর পর ফুল আসে। প্রতিটি ফুলের থোকায় ১৩ থেকে ১৮টি ফুল থাকে। ফুল কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হওয়ায় এ সময়ের মধ্যে পরাগায়ন করতে হয়। পরাগায়নের পর ফল পরিপক্ব হতে সাত থেকে আট মাস লাগে।

ফল সংগ্রহের পর গরম পানিতে রাখা, গাঁজন ও শুকানোর মাধ্যমে সুগন্ধি ভ্যানিলা বিন প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলার নির্যাস উৎপাদনের পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

বিশ্ববাজারে বড় সম্ভাবনা

ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যানিলার বৈশ্বিক বাজার ৪১০ কোটি ডলারের বেশি। ২০৩৪ সালে তা ৬৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিবছর বাজারটি ৬ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে।

বিশ্বে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা উৎপাদন ও রপ্তানিতে শীর্ষে মাদাগাস্কার। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের ভ্যানিলা রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় আমদানিকারক; একই বছর দেশটি প্রায় ১০ কোটি ডলারের ভ্যানিলা আমদানি করে।

ভ্যানিলা খাদ্য, পানীয়, কেক, আইসক্রিম, সুগন্ধি, প্রসাধনী ও ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত হয়। তবে এসব পণ্যে ব্যবহৃত ভ্যানিলা ফ্লেভারের ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ কৃত্রিম। ফলে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা বিনের বাজার আলাদা।

বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়াতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের আশা, পরিকল্পিত উদ্যোগে ভ্যানিলা ভবিষ্যতে দেশের নতুন রপ্তানিপণ্য হয়ে উঠতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ: সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ; কারখানা বন্ধ, নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন

Business Times24

দেশে ভ্যানিলা চাষের সম্ভাবনা, বিশ্ববাজারে কেজি ৩০ হাজার টাকা

Update Time : ১১:৫৮:১৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

দেশেই শুরু হয়েছে দামি মসলাপণ্য ভ্যানিলার চাষ। যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা চাষ করছেন উদ্যোক্তারা।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে প্রাকৃতিক ভ্যানিলার প্রতি কেজির দাম প্রায় ২৫০ ডলার বা ৩০ হাজার টাকা। তবে দেশে এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। চাষের সম্ভাবনা যাচাই ও উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে রপ্তানির স্বপ্ন দেখছেন উদ্যোক্তারা।

বগুড়ায় ২০১৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ভ্যানিলা চাষ শুরু করেন মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু হেনা ফয়সাল ফাহিম। ইন্দোনেশিয়ায় প্রশিক্ষণ শেষে সেখান থেকে ভ্যানিলাগাছের কাটিং এনে তিনি গবেষণা কেন্দ্রে রোপণ করেন। বর্তমানে সেখানে তিন শতক জমিতে ৬০টি ভ্যানিলাগাছ রয়েছে।

ফয়সাল ফাহিম বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ভ্যানিলা চাষের উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে এটি শ্রমঘন ও উচ্চ বিনিয়োগের ফসল। ৫০ শতক জমিতে এক হাজার গাছের বাণিজ্যিক প্রকল্প করতে প্রাথমিকভাবে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে। বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক কি না, তা যাচাইয়ের পর কৃষকদের কাটিং সরবরাহ করা হবে।

যশোরে ১৫০ গাছ

যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের স্বর্পরাজপুর গ্রামের উদ্যোক্তা মো. সারোয়ার হোসেন আম ও ড্রাগন চাষের পাশাপাশি ভ্যানিলা চাষ করছেন। ছায়াবৃত্ত ক্যানোপি পদ্ধতিতে চার বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেন তিনি। শুরুতে কিছু গাছ মারা গেলেও বর্তমানে তাঁর বাগানে প্রায় ১৫০টি ভ্যানিলাগাছ বেড়ে উঠছে।

সারোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ভ্যানিলা চাষের উপযোগী জায়গার অভাব নেই। ১০০ কৃষককে প্রয়োজনীয় কাটিং দেওয়া হলে চার-পাঁচ বছর পর এক হাজার কেজি ভ্যানিলা বিন রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করবেন।

ফল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা

ভ্যানিলা অর্কিডজাতীয় লতানো গাছের ফল। চারা রোপণের দুই থেকে তিন বছর পর ফুল আসে। প্রতিটি ফুলের থোকায় ১৩ থেকে ১৮টি ফুল থাকে। ফুল কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হওয়ায় এ সময়ের মধ্যে পরাগায়ন করতে হয়। পরাগায়নের পর ফল পরিপক্ব হতে সাত থেকে আট মাস লাগে।

ফল সংগ্রহের পর গরম পানিতে রাখা, গাঁজন ও শুকানোর মাধ্যমে সুগন্ধি ভ্যানিলা বিন প্রস্তুত করা হয়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ভ্যানিলার নির্যাস উৎপাদনের পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি।

বিশ্ববাজারে বড় সম্ভাবনা

ফরচুন বিজনেস ইনসাইটসের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যানিলার বৈশ্বিক বাজার ৪১০ কোটি ডলারের বেশি। ২০৩৪ সালে তা ৬৭০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রতিবছর বাজারটি ৬ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে।

বিশ্বে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা উৎপাদন ও রপ্তানিতে শীর্ষে মাদাগাস্কার। ২০২৫ সালে দেশটি প্রায় ১২ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের ভ্যানিলা রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় আমদানিকারক; একই বছর দেশটি প্রায় ১০ কোটি ডলারের ভ্যানিলা আমদানি করে।

ভ্যানিলা খাদ্য, পানীয়, কেক, আইসক্রিম, সুগন্ধি, প্রসাধনী ও ওষুধশিল্পে ব্যবহৃত হয়। তবে এসব পণ্যে ব্যবহৃত ভ্যানিলা ফ্লেভারের ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ কৃত্রিম। ফলে প্রাকৃতিক ভ্যানিলা বিনের বাজার আলাদা।

বাংলাদেশে উৎপাদন বাড়াতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের আশা, পরিকল্পিত উদ্যোগে ভ্যানিলা ভবিষ্যতে দেশের নতুন রপ্তানিপণ্য হয়ে উঠতে পারে।