পাঁচ জেলায় তিন হাজারের বেশি কুমার পরিবারে ব্যস্ততা | একেক পরিবার তৈরি করছে ২০ হাজার থেকে দুই লাখ প্রদীপ | উৎসবের মৌসুমে ৬০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা আয়ের আশা
দীপাবলির আলোয় আলোকিত হওয়ার অপেক্ষায় রংপুর অঞ্চল। আগামীকাল হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দীপাবলি। এ উৎসবকে সামনে রেখে রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার কুমারপল্লিগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। দিন-রাত পরিশ্রম করে তৈরি করছেন মাটির প্রদীপ, স্থানীয়ভাবে যা ‘দিয়ার’ নামে পরিচিত। উৎসবের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রদীপ বিক্রির আয় দিয়ে সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন দেখছেন হাজারো কুমার পরিবারের সদস্যরা।
রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের তিন হাজারের বেশি কুমার পরিবার দীপাবলি উপলক্ষে মাটির প্রদীপ তৈরি করে। প্রায় এক মাস আগে থেকেই শুরু হয়েছে তাদের প্রস্তুতি। একেকটি পরিবার ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত প্রদীপ তৈরি করছে। কোনো কোনো পরিবার আবার উৎপাদন ও সরবরাহ মিলিয়ে দুই লাখ প্রদীপ বিক্রির লক্ষ্য নিয়েছে।
কুমারদের কাছে দীপাবলি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বছরের অন্যতম বড় আয়ের মৌসুম। এ সময় প্রদীপের চাহিদা বাড়ায় তাদের কর্মসংস্থান ও উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়।
স্থানীয় বাজারে বর্তমানে সাধারণ মানের ১০০টি প্রদীপ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। মাঝারি মানের প্রদীপের দাম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং উন্নত মানের প্রদীপের দাম ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর গ্রামের কুমার প্রভাত চন্দ্র পাল (৬৫) এবার প্রায় ৭৫ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, পাইকারেরা প্রদীপ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি হাটেও বিক্রি করছেন। এবার ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট কুমারপাড়ার বিষাদ চন্দ্র পাল (৫৫) জানান, আকারভেদে তারা তিন ধরনের প্রদীপ তৈরি করেন। বর্তমানে ১০০টি প্রদীপ তৈরিতে খরচ হয় ২০ থেকে ৫০ টাকা। এবার তিনি ইতিমধ্যে ৬০ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছেন।
রংপুরের তারাগঞ্জের পালপাড়ার প্রবীণ মৃৎশিল্পী অজয় চন্দ্র পাল (৭৬) বলেন, একসঙ্গে তিন থেকে পাঁচ হাজার প্রদীপ চুল্লিতে পোড়ানো যায়। আগুন নিভে যাওয়ার প্রায় ১২ ঘণ্টা পর সেগুলো বের করা হয়। তার পরিবার এবার ৭৫ হাজার প্রদীপ তৈরি করেছে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার পালপাড়ার সুরেশ চন্দ্র পাল (৫০) নিজে ৬৫ হাজার প্রদীপ তৈরির পাশাপাশি পাইকারি সরবরাহের কাজও করেন। এবার তার লক্ষ্য দুই লাখ প্রদীপ বিক্রি করা।
রংপুরের মাহিগঞ্জ কুমারপাড়ার টুটুল চন্দ্র পাল (৫৫) জানান, দীপাবলিকে কেন্দ্র করে প্রতিটি কুমার পরিবার ৬০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে। বছরের অন্য সময়ের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় এ আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে পেশাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে তার। তিনি বলেন, তাদের গ্রামের ৫৫টি কুমার পরিবারের অর্ধেকের বেশি এখন আর মাটির কাজ করে না। অনেকে পেশা পরিবর্তন করেছেন।
অন্যদিকে, উৎসব ঘিরে ক্রেতাদের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়ার বাসিন্দা অশোক সরকার (৭০) জানান, তিনি প্রতিবছর ৭০০ থেকে ৮০০ প্রদীপ কেনেন। এবার এক হাজার প্রদীপ জ্বালানোর পরিকল্পনা করেছেন।
পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় আড়াই লাখ হিন্দু পরিবার বসবাস করে। দীপাবলি উপলক্ষে প্রতিটি পরিবার ৩০০ থেকে ৮০০টি পর্যন্ত প্রদীপ কেনে। ফলে উৎসবকে কেন্দ্র করে মাটির প্রদীপের বড় বাজার তৈরি হয়। এ বাজারের ওপর নির্ভরশীল হাজারো মৃৎশিল্পী পরিবার।
রংপুর বিভাগীয় পুরোহিত সোসাইটির আহ্বায়ক ধীমান ভট্টাচার্য বলেন, প্রদীপ জ্বালানো শুধু আলোকসজ্জার বিষয় নয়, এটি প্রার্থনারও অংশ। এর মাধ্যমে প্রয়াত আত্মার শান্তি এবং সাম্য ও কল্যাণ কামনা করা হয়। কুমার পরিবারগুলোও নিজেদের বাড়িতে প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি উদযাপন করে।
সব মিলিয়ে দীপাবলির আলো রংপুরের কুমারপল্লিগুলোতে নিয়ে এসেছে নতুন আশার বার্তা। উৎসবের এই মৌসুমে মাটির প্রদীপের চাহিদা যেমন মৃৎশিল্পীদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, তেমনি তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশাকে টিকিয়ে রাখারও সুযোগ তৈরি করছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























