২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে চায় ওয়াশিংটন, ২০৩৬ সালের লক্ষ্য মস্কো ও বেইজিংয়ের। বিদ্যুৎ উৎপাদন, খনিজ সম্পদ আহরণ ও মহাকাশে কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতেই এই প্রতিযোগিতা।
চাঁদে স্থায়ী মানবঘাঁটি নির্মাণ, বরফ থেকে পানি ও জ্বালানি উৎপাদন এবং মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে বিশ্বের প্রধান মহাকাশ শক্তিগুলো। এ লক্ষ্য সামনে রেখে চাঁদের মাটিতে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মহাকাশ গবেষণায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। একই সঙ্গে চাঁদকে ঘিরে পরাশক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও নতুন মাত্রা পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া চীনের সঙ্গে যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তাদের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে একটি স্থায়ী গবেষণা ও মানববসতির অবকাঠামো গড়ে তোলা।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে দুই দেশের পরিকল্পনা
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ থেকে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রায় ছয় হাজার কেজির কম ওজনের এই চুল্লি পাঁচ বছর পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার তৈরি ‘সেলেনা’ চুল্লি থেকে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ওজন হবে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি। এটি ১০ বছর পর্যন্ত চালু রাখার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩৬ সালের দিকে চীন ও রাশিয়ার পরিকল্পিত চন্দ্রঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহে এটি ব্যবহার করা হতে পারে।
কেন পারমাণবিক শক্তির ওপর নির্ভরতা
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি পরিচালনার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে সৌরবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চাঁদের কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রায় দুই সপ্তাহ সূর্যের আলো পাওয়া যায় না। ফলে শুধু সৌর প্যানেলের ওপর নির্ভর করে গবেষণাগার, যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য স্থাপনা সচল রাখা কঠিন।
যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গের মতে, সৌরশক্তি, ব্যাটারি ও ডিজেলের তুলনায় পারমাণবিক শক্তি দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যকর সমাধান হতে পারে।
চাঁদের দক্ষিণ মেরুর গভীর গর্তে জমে থাকা বরফও এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বরফ থেকে পানি, অক্সিজেন ও রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব। পাশাপাশি অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো খনিজ আহরণের সম্ভাবনাও রয়েছে। এসব কাজে প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করবে পারমাণবিক চুল্লি।
প্রতিযোগিতার পেছনে ভূরাজনীতি
চাঁদে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও এই প্রতিযোগিতার অন্যতম চালিকা শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক নির্বাহী আদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও চাঁদে যৌথ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা জানিয়েছেন।
নিরাপত্তা ও আইনি প্রশ্ন
তবে এই উদ্যোগে দুর্ঘটনা ও তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কসমস ৯৫৪’ উপগ্রহ পৃথিবীতে ভেঙে পড়ার পর কানাডার বিস্তীর্ণ এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়েছিল। এ ঘটনা মহাকাশে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদে চুল্লি স্থাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রযুক্তি নয়; নিরাপদ অবতরণ, উৎক্ষেপণের অনুমোদন এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদের ভূখণ্ডের মালিকানা দাবি করতে পারে না। তবে নিজস্ব স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির মালিকানা রাখতে পারে। চাঁদে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে সরাসরি নিষেধাজ্ঞাও নেই।
তবে চুল্লি স্থাপনের মাধ্যমে কোনো দেশ নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করলে অন্য দেশের প্রবেশ কার্যত সীমিত হয়ে পড়তে পারে। ফলে চাঁদের সম্পদ ব্যবহারের অধিকার, নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ নিয়ে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রয়োজন বাড়বে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















