০৭:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
আমদানি ব্যয়, পরিবহন সংকট ও বাজারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় চাপে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার

প্রতিবেশীদের চেয়ে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে এলপিজি

The gallery was not found!

বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া, আমদানির উৎস পরিবর্তন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে দেশের এলপিজি খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১১৩ টাকা থাকলেও নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের আমদানি ও বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ব্যয় বেড়েছে। বড় ক্রেতা দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আমদানি পরিমাণ কম হওয়ায় দর-কষাকষিতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের সঙ্গে স্থানীয় ব্যয় যুক্ত হয়ে খুচরা দামে প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেশীদের তুলনায় বেশি দাম

নভেম্বরের প্রকাশিত খুচরা দর অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা। বিপরীতে পাকিস্তানে প্রায় ১৩২ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৩০ টাকা এবং নেপালে ১১৯ টাকা। অর্থাৎ এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি।

তবে দেশভিত্তিক দামের তুলনায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাকিস্তানে সরকারি নির্ধারিত দরের সঙ্গে খোলাবাজারের দামের পার্থক্য থাকতে পারে। ভারতে গৃহস্থালি এলপিজিতে সরকারি ভর্তুকি থাকায় সেখানকার দাম বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। দেশটির বাণিজ্যিক এলপিজির দাম বরং বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভারতের গৃহস্থালি গ্রাহকরা সরকারি ভর্তুকির কারণে কম দামে এলপিজি পান। অন্যদিকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের বাজারভিত্তিক দাম দিতে হয়। পাকিস্তানেও সরকারি নির্ধারিত দাম ও প্রকৃত বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

আমদানিতে ছোট ক্রেতার সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো তুলনামূলক কম পরিমাণে কেনাকাটা। ভারতের আমদানিকারকরা একেকটি জাহাজে প্রায় এক লাখ টন এলপিজি কিনতে পারেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণে আমদানি করে।

আন্তর্জাতিক বাজারে একই সরবরাহকারীর কাছে ভারত ও বাংলাদেশের ক্রেতারা গেলে বড় ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই বেশি সুবিধা পান। বেশি পরিমাণে কেনার কারণে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে এবং আমদানি ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এ ছাড়া ভারতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির আওতায় তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে। বাংলাদেশে এ ধরনের চুক্তি রয়েছে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। অন্য অনেক আমদানিকারককে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্পট মার্কেটে আন্তর্জাতিক দাম ওঠানামার ঝুঁকি বেশি। সরবরাহ সংকট দেখা দিলে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্যবাহী জাহাজ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আমদানিকারকদের বাড়তি প্রিমিয়াম দিতে হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পড়ে।

বিইআরসি চেয়ারম্যানের মতে, বাংলাদেশের তুলনামূলক কম আমদানি পরিমাণ এবং স্পট মার্কেটনির্ভরতা এলপিজির ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়

২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে বাংলাদেশ এলপিজির বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করত। কিন্তু সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়েছে।

বিইআরসির দেশভিত্তিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলপিজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৮৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে ওমান থেকে আমদানির অংশ ৪১ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলপিজি নিয়ে জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসতে সময় লাগে প্রায় দুই সপ্তাহ। দীর্ঘ যাত্রার কারণে জাহাজের ভাড়া, বিমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, সংঘাতের আগে প্রতি টন এলপিজি পরিবহনে ব্যয় ছিল প্রায় ৮২ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ২৫০ ডলারে পৌঁছেছে।

এদিকে বড় মাদার ভেসেল থেকে এলপিজি ছোট জাহাজে স্থানান্তর করে বাংলাদেশের বন্দরে আনতে হয়। এতে পণ্য ওঠানো-নামানোর অতিরিক্ত ধাপ যুক্ত হওয়ায় পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ে।

আন্তর্জাতিক বাজারদর ও স্থানীয় চার্জ

বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) প্রধান বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নভেম্বরে প্রোপেনের দাম প্রতি টন ৭২০ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭৮০ ডলার নির্ধারণ করা হয়। বিইআরসি ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ ধরে গড় মূল্য হিসাব করে।

এই হিসাবে মিশ্র এলপিজির প্রতি টনের গড় দাম দাঁড়ায় ৭৫৯ ডলার। কিন্তু উত্তর এশিয়ার বাজারে একই মিশ্রণের দাম প্রায় ১ হাজার ২৯ ডলার। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের এই দরের সঙ্গে সৌদি সিপির ব্যবধান প্রায় ৩৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ আমদানির উৎস পরিবর্তন করলেও মূল্য নির্ধারণে সৌদি সিপি ব্যবহার করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত ক্রয়মূল্য, সরবরাহকারীকে দেওয়া প্রিমিয়াম এবং পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে বিইআরসির বেঞ্চমার্কের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

এর পাশাপাশি স্থানীয় সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ ও বিতরণ চার্জও বেড়েছে। নভেম্বরের মূল্য সমন্বয়ে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা হয়েছে। পরিবেশকদের চার্জ ৭০ শতাংশ বেড়ে ৭ টাকা ৮ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা হয়েছে।

১২ কেজির সিলিন্ডারে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ২০১ টাকা থেকে বেড়ে ২৮২ টাকা হয়েছে। পরিবেশকদের চার্জ ৫০ টাকা থেকে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৪৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা হয়েছে।

বিইআরসির নভেম্বরের মূল্য সমন্বয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

বাজারের কাঠামো ও অব্যবহৃত সক্ষমতা

বাংলাদেশে এলপিজি বাজারের বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৩টি। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল মোট আমদানির ৮৬ শতাংশ।

দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতা ৬৩ লাখ ৮০ হাজার টন। বেসরকারি খাতে সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৩৫ টন। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ছিল বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতার মাত্র ২৭ শতাংশের মতো।

অর্থাৎ লাইসেন্সপ্রাপ্ত সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। বাজারে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, ছোট পরিমাণে আমদানি এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির স্বল্পতা প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে ওঠার পথে বাধা তৈরি করছে।

সরকারি পর্যায়ে সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজেই এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু দরপত্রে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব না পাওয়ায় এখন বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে সংস্থাটি।

বিপিসি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণাগার ব্যবহার এবং বিপণন অংশীদার খুঁজে বের করার বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে এখনো কোনো ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘ পরিবহনপথ, আমদানিতে সীমিত দর-কষাকষির ক্ষমতা এবং স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার ব্যয় বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। বড় পরিমাণে আমদানি, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, সংরক্ষণ সক্ষমতার ব্যবহার এবং বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা বাড়ানো গেলে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ইসলামী ব্যাংকে আস্থার সংকট কাটছে না: সাড়ে চার মাসেও ৩,৩০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান

Business Times24

আমদানি ব্যয়, পরিবহন সংকট ও বাজারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় চাপে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজার

প্রতিবেশীদের চেয়ে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি দামে এলপিজি

Update Time : ১১:৫৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া, আমদানির উৎস পরিবর্তন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে দেশের এলপিজি খাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১১৩ টাকা থাকলেও নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সায়। অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসে দাম বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের আমদানি ও বিতরণব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে ব্যয় বেড়েছে। বড় ক্রেতা দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আমদানি পরিমাণ কম হওয়ায় দর-কষাকষিতেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের সঙ্গে স্থানীয় ব্যয় যুক্ত হয়ে খুচরা দামে প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেশীদের তুলনায় বেশি দাম

নভেম্বরের প্রকাশিত খুচরা দর অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা। বিপরীতে পাকিস্তানে প্রায় ১৩২ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৩০ টাকা এবং নেপালে ১১৯ টাকা। অর্থাৎ এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি।

তবে দেশভিত্তিক দামের তুলনায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাকিস্তানে সরকারি নির্ধারিত দরের সঙ্গে খোলাবাজারের দামের পার্থক্য থাকতে পারে। ভারতে গৃহস্থালি এলপিজিতে সরকারি ভর্তুকি থাকায় সেখানকার দাম বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। দেশটির বাণিজ্যিক এলপিজির দাম বরং বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ভারতের গৃহস্থালি গ্রাহকরা সরকারি ভর্তুকির কারণে কম দামে এলপিজি পান। অন্যদিকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের বাজারভিত্তিক দাম দিতে হয়। পাকিস্তানেও সরকারি নির্ধারিত দাম ও প্রকৃত বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

আমদানিতে ছোট ক্রেতার সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের এলপিজি আমদানির অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো তুলনামূলক কম পরিমাণে কেনাকাটা। ভারতের আমদানিকারকরা একেকটি জাহাজে প্রায় এক লাখ টন এলপিজি কিনতে পারেন। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণে আমদানি করে।

আন্তর্জাতিক বাজারে একই সরবরাহকারীর কাছে ভারত ও বাংলাদেশের ক্রেতারা গেলে বড় ক্রেতারা স্বাভাবিকভাবেই বেশি সুবিধা পান। বেশি পরিমাণে কেনার কারণে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ে এবং আমদানি ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।

এ ছাড়া ভারতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির আওতায় তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি এলপিজি আমদানি করে। বাংলাদেশে এ ধরনের চুক্তি রয়েছে মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের। অন্য অনেক আমদানিকারককে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়।

স্পট মার্কেটে আন্তর্জাতিক দাম ওঠানামার ঝুঁকি বেশি। সরবরাহ সংকট দেখা দিলে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্যবাহী জাহাজ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আমদানিকারকদের বাড়তি প্রিমিয়াম দিতে হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারে পড়ে।

বিইআরসি চেয়ারম্যানের মতে, বাংলাদেশের তুলনামূলক কম আমদানি পরিমাণ এবং স্পট মার্কেটনির্ভরতা এলপিজির ব্যয় বাড়ানোর অন্যতম কারণ।

যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়

২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগে বাংলাদেশ এলপিজির বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করত। কিন্তু সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়েছে।

বিইআরসির দেশভিত্তিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলপিজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বেড়ে ৮৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে ওমান থেকে আমদানির অংশ ৪১ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলপিজি নিয়ে জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসতে সময় লাগে প্রায় দুই সপ্তাহ। দীর্ঘ যাত্রার কারণে জাহাজের ভাড়া, বিমা ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, সংঘাতের আগে প্রতি টন এলপিজি পরিবহনে ব্যয় ছিল প্রায় ৮২ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ২৫০ ডলারে পৌঁছেছে।

এদিকে বড় মাদার ভেসেল থেকে এলপিজি ছোট জাহাজে স্থানান্তর করে বাংলাদেশের বন্দরে আনতে হয়। এতে পণ্য ওঠানো-নামানোর অতিরিক্ত ধাপ যুক্ত হওয়ায় পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বাড়ে।

আন্তর্জাতিক বাজারদর ও স্থানীয় চার্জ

বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) প্রধান বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নভেম্বরে প্রোপেনের দাম প্রতি টন ৭২০ ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭৮০ ডলার নির্ধারণ করা হয়। বিইআরসি ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ ধরে গড় মূল্য হিসাব করে।

এই হিসাবে মিশ্র এলপিজির প্রতি টনের গড় দাম দাঁড়ায় ৭৫৯ ডলার। কিন্তু উত্তর এশিয়ার বাজারে একই মিশ্রণের দাম প্রায় ১ হাজার ২৯ ডলার। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের এই দরের সঙ্গে সৌদি সিপির ব্যবধান প্রায় ৩৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ আমদানির উৎস পরিবর্তন করলেও মূল্য নির্ধারণে সৌদি সিপি ব্যবহার করছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকৃত ক্রয়মূল্য, সরবরাহকারীকে দেওয়া প্রিমিয়াম এবং পরিবহন ব্যয়ের সঙ্গে বিইআরসির বেঞ্চমার্কের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

এর পাশাপাশি স্থানীয় সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ ও বিতরণ চার্জও বেড়েছে। নভেম্বরের মূল্য সমন্বয়ে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা হয়েছে। পরিবেশকদের চার্জ ৭০ শতাংশ বেড়ে ৭ টাকা ৮ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা হয়েছে।

১২ কেজির সিলিন্ডারে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ২০১ টাকা থেকে বেড়ে ২৮২ টাকা হয়েছে। পরিবেশকদের চার্জ ৫০ টাকা থেকে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৪৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা হয়েছে।

বিইআরসির নভেম্বরের মূল্য সমন্বয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

বাজারের কাঠামো ও অব্যবহৃত সক্ষমতা

বাংলাদেশে এলপিজি বাজারের বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৩টি। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল মোট আমদানির ৮৬ শতাংশ।

দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতা ৬৩ লাখ ৮০ হাজার টন। বেসরকারি খাতে সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৬৩৫ টন। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি ছিল বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতার মাত্র ২৭ শতাংশের মতো।

অর্থাৎ লাইসেন্সপ্রাপ্ত সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত থাকছে। বাজারে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, ছোট পরিমাণে আমদানি এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির স্বল্পতা প্রতিযোগিতামূলক বাজার গড়ে ওঠার পথে বাধা তৈরি করছে।

সরকারি পর্যায়ে সরাসরি এলপিজি আমদানির উদ্যোগও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজেই এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু দরপত্রে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব না পাওয়ায় এখন বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে সংস্থাটি।

বিপিসি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণাগার ব্যবহার এবং বিপণন অংশীদার খুঁজে বের করার বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে এখনো কোনো ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান।

সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘ পরিবহনপথ, আমদানিতে সীমিত দর-কষাকষির ক্ষমতা এবং স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার ব্যয় বাংলাদেশের এলপিজি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। বড় পরিমাণে আমদানি, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, সংরক্ষণ সক্ষমতার ব্যবহার এবং বাজারে কার্যকর প্রতিযোগিতা বাড়ানো গেলে ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।