০৭:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংসে একাধিক রেকর্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩০ রানের লিড বাংলাদেশের

The gallery was not found!

এক সপ্তাহ আগেও সমালোচনার কেন্দ্রে ছিলেন তাওহিদ হৃদয়। পরপর দুটি অদ্ভুত শটে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন তার ব্যাটিংয়ের ধরন ও টেস্ট দলে জায়গা। সেই হৃদয়ই এবার ব্যাট হাতে দিলেন জবাব। সিলেট টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেললেন ২৪২ রানের অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। তার ব্যাটিং নৈপুণ্যে শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডই গড়েননি, বিপর্যয়ের মুখে থাকা বাংলাদেশকেও এনে দিয়েছেন ৩০ রানের লিড।

একসময় বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১৮৪ রান, হারিয়ে গেছে সাত উইকেট। দুইশ রানও পেরোনো কঠিন মনে হচ্ছিল। সেখান থেকে ইনিংসের হাল ধরেন হৃদয়। একপ্রান্তে সতীর্থদের আসা-যাওয়া চললেও অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২৫৯ বলে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় ২৪২ রান করে অপরাজিত থাকেন। তার অসাধারণ ইনিংসে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ৩৮৬ রান।

প্রথম সেঞ্চুরিতেই ডাবল সেঞ্চুরির ইতিহাস

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখেছেন হৃদয়। দেশের হয়ে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন তিনি। মাত্র তৃতীয় টেস্টে খেলতে নেমে ছাড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের আগের রেকর্ড।

এর আগে টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ছিল মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রান। হৃদয়ের ২৪২ রান সেই রেকর্ড নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। তামিম ইকবালের সাত ছক্কার রেকর্ড পেছনে ফেলে ১১টি ছক্কা মেরেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। বিশ্ব রেকর্ডেরও খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি।

সুযোগ পেয়েই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ

হৃদয়ের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নাটকীয় এক প্রেক্ষাপট। আগের টেস্টে মুশফিকুর রহিমের চোটের কারণে একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এবার মুমিনুল হকের অনুপস্থিতিতে খেলার সুযোগ পান। কনকাশন প্রটোকলের নিয়মে মুমিনুলের জায়গায় খেলতে না পারলে সিলেট টেস্টে হৃদয়ের সুযোগ পাওয়া কঠিন হতো।

অথচ গত সপ্তাহেই দুটি অস্বাভাবিক শটে আউট হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। তার ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এবার সেই সমালোচনার জবাব দিলেন ব্যাট হাতে। অভিজ্ঞ দুই সতীর্থ মুশফিক ও মুমিনুলের জায়গায় পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদেরই একটি রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন।

বিপর্যয়ের মধ্যে ঠান্ডা মাথায় লড়াই

গতকাল বিকেলে যখন ব্যাট করতে নামেন, তখন বাংলাদেশ বেশ চাপে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বিদায়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গে নিয়ে দিনের শেষ ভাগে উইকেট আগলে রাখেন হৃদয়। পরদিন সকালে ব্যাটিংয়ে নেমে ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি।

চার-ছক্কায় রানের গতি বাড়ানোর সময় মুশফিকের সঙ্গে ভালো জুটির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জোমেল ওয়ারিকনের বলে পরপর ফিরে যান মুশফিক ও লিটন দাস। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।

বাংলাদেশের ইনিংস তখন আবারও বিপর্যয়ের মুখে। এমন পরিস্থিতিতে হৃদয়ের পাশে দাঁড়ান তাইজুল ইসলাম। ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন এই বাঁহাতি স্পিনার।

তাইজুলের সঙ্গে রেকর্ড জুটি

অষ্টম উইকেটে হৃদয় ও তাইজুলের ১১৭ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসকে নতুন প্রাণ দেয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অষ্টম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি।

পুরনো বলে ক্যারিবীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে আসতেই আক্রমণ বাড়ান হৃদয়। চার ও ছক্কায় প্রতিপক্ষের বোলারদের চাপে ফেলেন। একই সঙ্গে তাইজুলকে আগলে রেখে ওভারের শেষ দিকে প্রান্ত বদলের কৌশল কাজে লাগান। ফলে দুই প্রান্ত থেকে উইকেট নেওয়ার সুযোগ কমে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের।

তবে ইনিংসে কিছুটা ভাগ্যও সহায় ছিল হৃদয়ের। সেঞ্চুরির পর শামার জোসেফের বলে আম্পায়ার্স কলে বেঁচে যান একবার। ডাবল সেঞ্চুরি পেরোনোর পর ওয়ারিকনের বলে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়েও দুবার রক্ষা পান। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও কিছু রান যোগ করেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত তাসকিন আহমেদের বিদায়ে বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। তবে অপরাজিত থেকে যান হৃদয়।

দেড়শ রানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা থেকে লিড

হৃদয়ের ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের ইনিংসের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। একপর্যায়ে দেড়শ রানে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত ৩০ রানের লিড নেয় নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংস তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়া, ধৈর্য ধরে লড়াই করা এবং সুযোগকে সাফল্যে পরিণত করার অনন্য উদাহরণ। মাত্র তৃতীয় টেস্টেই এমন ইনিংস খেলে নিজের সামর্থ্যের জানান দিলেন তিনি। সমালোচনার জবাব দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে উপহার দিলেন স্মরণীয় এক দিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ইসলামী ব্যাংকে আস্থার সংকট কাটছে না: সাড়ে চার মাসেও ৩,৩০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান

Business Times24

২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংসে একাধিক রেকর্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩০ রানের লিড বাংলাদেশের

Update Time : ০৪:৪৬:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

এক সপ্তাহ আগেও সমালোচনার কেন্দ্রে ছিলেন তাওহিদ হৃদয়। পরপর দুটি অদ্ভুত শটে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন তার ব্যাটিংয়ের ধরন ও টেস্ট দলে জায়গা। সেই হৃদয়ই এবার ব্যাট হাতে দিলেন জবাব। সিলেট টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খেললেন ২৪২ রানের অবিশ্বাস্য এক ইনিংস। তার ব্যাটিং নৈপুণ্যে শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডই গড়েননি, বিপর্যয়ের মুখে থাকা বাংলাদেশকেও এনে দিয়েছেন ৩০ রানের লিড।

একসময় বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১৮৪ রান, হারিয়ে গেছে সাত উইকেট। দুইশ রানও পেরোনো কঠিন মনে হচ্ছিল। সেখান থেকে ইনিংসের হাল ধরেন হৃদয়। একপ্রান্তে সতীর্থদের আসা-যাওয়া চললেও অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ২৫৯ বলে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় ২৪২ রান করে অপরাজিত থাকেন। তার অসাধারণ ইনিংসে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ৩৮৬ রান।

প্রথম সেঞ্চুরিতেই ডাবল সেঞ্চুরির ইতিহাস

বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন ইতিহাস লিখেছেন হৃদয়। দেশের হয়ে নিজের প্রথম সেঞ্চুরিকেই ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দিয়েছেন তিনি। মাত্র তৃতীয় টেস্টে খেলতে নেমে ছাড়িয়ে গেছেন বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের আগের রেকর্ড।

এর আগে টেস্টে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস ছিল মুশফিকুর রহিমের ২১৯ রান। হৃদয়ের ২৪২ রান সেই রেকর্ড নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন তিনি। তামিম ইকবালের সাত ছক্কার রেকর্ড পেছনে ফেলে ১১টি ছক্কা মেরেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। বিশ্ব রেকর্ডেরও খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি।

সুযোগ পেয়েই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ

হৃদয়ের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নাটকীয় এক প্রেক্ষাপট। আগের টেস্টে মুশফিকুর রহিমের চোটের কারণে একাদশে সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এবার মুমিনুল হকের অনুপস্থিতিতে খেলার সুযোগ পান। কনকাশন প্রটোকলের নিয়মে মুমিনুলের জায়গায় খেলতে না পারলে সিলেট টেস্টে হৃদয়ের সুযোগ পাওয়া কঠিন হতো।

অথচ গত সপ্তাহেই দুটি অস্বাভাবিক শটে আউট হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি। তার ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এবার সেই সমালোচনার জবাব দিলেন ব্যাট হাতে। অভিজ্ঞ দুই সতীর্থ মুশফিক ও মুমিনুলের জায়গায় পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদেরই একটি রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন।

বিপর্যয়ের মধ্যে ঠান্ডা মাথায় লড়াই

গতকাল বিকেলে যখন ব্যাট করতে নামেন, তখন বাংলাদেশ বেশ চাপে। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বিদায়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। মুশফিকুর রহিমকে সঙ্গে নিয়ে দিনের শেষ ভাগে উইকেট আগলে রাখেন হৃদয়। পরদিন সকালে ব্যাটিংয়ে নেমে ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন তিনি।

চার-ছক্কায় রানের গতি বাড়ানোর সময় মুশফিকের সঙ্গে ভালো জুটির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু জোমেল ওয়ারিকনের বলে পরপর ফিরে যান মুশফিক ও লিটন দাস। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।

বাংলাদেশের ইনিংস তখন আবারও বিপর্যয়ের মুখে। এমন পরিস্থিতিতে হৃদয়ের পাশে দাঁড়ান তাইজুল ইসলাম। ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তাকে যোগ্য সঙ্গ দেন এই বাঁহাতি স্পিনার।

তাইজুলের সঙ্গে রেকর্ড জুটি

অষ্টম উইকেটে হৃদয় ও তাইজুলের ১১৭ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসকে নতুন প্রাণ দেয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অষ্টম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি।

পুরনো বলে ক্যারিবীয় বোলারদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে আসতেই আক্রমণ বাড়ান হৃদয়। চার ও ছক্কায় প্রতিপক্ষের বোলারদের চাপে ফেলেন। একই সঙ্গে তাইজুলকে আগলে রেখে ওভারের শেষ দিকে প্রান্ত বদলের কৌশল কাজে লাগান। ফলে দুই প্রান্ত থেকে উইকেট নেওয়ার সুযোগ কমে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের।

তবে ইনিংসে কিছুটা ভাগ্যও সহায় ছিল হৃদয়ের। সেঞ্চুরির পর শামার জোসেফের বলে আম্পায়ার্স কলে বেঁচে যান একবার। ডাবল সেঞ্চুরি পেরোনোর পর ওয়ারিকনের বলে উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়েও দুবার রক্ষা পান। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও কিছু রান যোগ করেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত তাসকিন আহমেদের বিদায়ে বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। তবে অপরাজিত থেকে যান হৃদয়।

দেড়শ রানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা থেকে লিড

হৃদয়ের ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের ইনিংসের চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। একপর্যায়ে দেড়শ রানে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত ৩০ রানের লিড নেয় নাজমুল হোসেন শান্তর দল।

বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে হৃদয়ের ২৪২ রানের ইনিংস তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়া, ধৈর্য ধরে লড়াই করা এবং সুযোগকে সাফল্যে পরিণত করার অনন্য উদাহরণ। মাত্র তৃতীয় টেস্টেই এমন ইনিংস খেলে নিজের সামর্থ্যের জানান দিলেন তিনি। সমালোচনার জবাব দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে উপহার দিলেন স্মরণীয় এক দিন।