০৭:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

‘আমাদের কিছুই নেই’: ইয়েমেনের তাইজে প্লাস্টিক কুড়িয়ে বেঁচে থাকার লড়াই বাস্তুচ্যুত মায়েদের

The gallery was not found!

ইয়েমেনের অবরুদ্ধ তাইজ শহরে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন সংগ্রাম করছেন দুই বাস্তুচ্যুত মা। যুদ্ধের কারণে তিন সপ্তাহ আগে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসা এই নারীরা এখন একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, শীত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় খাবার। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা এখন রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত প্রায় তিন লাখ মানুষের অর্ধেকই আশ্রয় নিয়েছে তাইজ শহরে। গত ৩ অক্টোবর থেকে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র হওয়ায় শহরটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের শহর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাস্তুচ্যুত নারী ফাতিমা আবদুল্লাহ কাসেম জানান, তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের আল-ধাবাব এলাকার আল-সায়াহি গ্রামে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা মাঝরাতে পায়ে হেঁটে পালিয়ে আসেন। বর্তমানে যে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন, সেটি এতটাই অপরিচ্ছন্ন ছিল যে সেখানে থাকার আগে দুই দিন তাঁরা রাস্তায় রাত কাটান।

নিজেদের অস্থায়ী আশ্রয়ের অবস্থা বর্ণনা করে কাসেম বলেন, ‘দেখুন, ভবনটি খোলা। আমরা ত্রিপল দিয়ে ঘিরে রেখেছি। কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডা। আমাদের কোনো কম্বল নেই, কিছুই নেই। আল্লাহর কসম, আমাদের কিছুই নেই।’

আট সন্তানের মা কাসেম স্বামীর থেকে আলাদা থাকেন। ২০১৭ সালে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তাঁর এক ছেলে নিহত হন। যুদ্ধের কারণে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর সন্তানদের দেখভাল ও খাবার জোগাড়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর এসে পড়েছে।

অন্যদিকে, সাত সন্তানের বিধবা মা ইনতিজার আহমেদ সাঈদও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। আগে তাঁরা সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু সংঘাতের কারণে সেই জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।

সাঈদ জানান, প্রতিদিনের পরিশ্রমের বিনিময়ে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে সন্তানদের খাবার জোগানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমার জীবন প্রতিদিনই সংগ্রামের। আল্লাহর কসম, প্রতিদিন লড়াই করতে হয়। আমি ১ হাজার ৫০০ রিয়াল (প্রায় ৯৬ সেন্ট) আয় করি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।’

খাবারের সংকট কতটা তীব্র, তা বোঝাতে গিয়ে সাঈদ বলেন, আলু, টমেটো ও মরিচের জন্যও তাঁকে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়। তাঁর মেয়েরা ঘরের ভেতরে থাকে। তাদের নিয়ে কোথায় যাবেন, কীভাবে দেখাশোনা করবেন—তা নিয়ে প্রতিদিন উদ্বেগে কাটে তাঁর সময়।

সাঈদের ভাষ্য, পরিবারের পুরুষ সদস্য বলতে তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তারও কাজ নেই। ফলে সংসারের দায়িত্ব সামলানোর মতো কেউ নেই।

তাইজে চলমান সংঘর্ষের কারণে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শহরে মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা এবং সাধারণ মানুষের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বাস্তুচ্যুত এসব পরিবারের দুর্দশা ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের মানবিক প্রভাব তুলে ধরছে। বিশেষ করে এককভাবে সন্তানদের দায়িত্ব পালন করা মায়েদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় ও জীবিকার সংকট প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

ইসলামী ব্যাংকে আস্থার সংকট কাটছে না: সাড়ে চার মাসেও ৩,৩০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান

Business Times24

‘আমাদের কিছুই নেই’: ইয়েমেনের তাইজে প্লাস্টিক কুড়িয়ে বেঁচে থাকার লড়াই বাস্তুচ্যুত মায়েদের

Update Time : ১১:০৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

ইয়েমেনের অবরুদ্ধ তাইজ শহরে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন সংগ্রাম করছেন দুই বাস্তুচ্যুত মা। যুদ্ধের কারণে তিন সপ্তাহ আগে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসা এই নারীরা এখন একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, শীত থেকে বাঁচার ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় খাবার। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁরা এখন রাস্তায় প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে বাস্তুচ্যুত প্রায় তিন লাখ মানুষের অর্ধেকই আশ্রয় নিয়েছে তাইজ শহরে। গত ৩ অক্টোবর থেকে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র হওয়ায় শহরটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সাধারণ মানুষের শহর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাস্তুচ্যুত নারী ফাতিমা আবদুল্লাহ কাসেম জানান, তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের আল-ধাবাব এলাকার আল-সায়াহি গ্রামে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা মাঝরাতে পায়ে হেঁটে পালিয়ে আসেন। বর্তমানে যে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন, সেটি এতটাই অপরিচ্ছন্ন ছিল যে সেখানে থাকার আগে দুই দিন তাঁরা রাস্তায় রাত কাটান।

নিজেদের অস্থায়ী আশ্রয়ের অবস্থা বর্ণনা করে কাসেম বলেন, ‘দেখুন, ভবনটি খোলা। আমরা ত্রিপল দিয়ে ঘিরে রেখেছি। কিন্তু প্রচণ্ড ঠান্ডা। আমাদের কোনো কম্বল নেই, কিছুই নেই। আল্লাহর কসম, আমাদের কিছুই নেই।’

আট সন্তানের মা কাসেম স্বামীর থেকে আলাদা থাকেন। ২০১৭ সালে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তাঁর এক ছেলে নিহত হন। যুদ্ধের কারণে নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর সন্তানদের দেখভাল ও খাবার জোগাড়ের দায়িত্বও তাঁর ওপর এসে পড়েছে।

অন্যদিকে, সাত সন্তানের বিধবা মা ইনতিজার আহমেদ সাঈদও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। আগে তাঁরা সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু সংঘাতের কারণে সেই জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।

সাঈদ জানান, প্রতিদিনের পরিশ্রমের বিনিময়ে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে সন্তানদের খাবার জোগানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমার জীবন প্রতিদিনই সংগ্রামের। আল্লাহর কসম, প্রতিদিন লড়াই করতে হয়। আমি ১ হাজার ৫০০ রিয়াল (প্রায় ৯৬ সেন্ট) আয় করি, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।’

খাবারের সংকট কতটা তীব্র, তা বোঝাতে গিয়ে সাঈদ বলেন, আলু, টমেটো ও মরিচের জন্যও তাঁকে মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হয়। তাঁর মেয়েরা ঘরের ভেতরে থাকে। তাদের নিয়ে কোথায় যাবেন, কীভাবে দেখাশোনা করবেন—তা নিয়ে প্রতিদিন উদ্বেগে কাটে তাঁর সময়।

সাঈদের ভাষ্য, পরিবারের পুরুষ সদস্য বলতে তাঁর ১৫ বছর বয়সী ছেলে রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তারও কাজ নেই। ফলে সংসারের দায়িত্ব সামলানোর মতো কেউ নেই।

তাইজে চলমান সংঘর্ষের কারণে হাজার হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয়, খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শহরে মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা এবং সাধারণ মানুষের বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বাস্তুচ্যুত এসব পরিবারের দুর্দশা ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের মানবিক প্রভাব তুলে ধরছে। বিশেষ করে এককভাবে সন্তানদের দায়িত্ব পালন করা মায়েদের জন্য খাদ্য, আশ্রয় ও জীবিকার সংকট প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।