সন্ত্রাসের সেই দিন পেরিয়ে গেছে এক-চতুর্থাংশ শতাব্দী, বদলেছে গোয়েন্দা কৌশলও; কিন্তু ইরাক, আফগানিস্তান থেকে ইউক্রেন ও ৭ অক্টোবর—বারবার সামনে এসেছে একই প্রশ্ন: তথ্য হাতে থাকার পরও কেন বিপদ বুঝতে ভুল হয়?
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সেই দিনটি পেরিয়ে আজ ২৫ বছর। সময়ের সঙ্গে বদলেছে বিশ্ব রাজনীতি, বদলেছে যুদ্ধের ধরন, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির কৌশল। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত—৯/১১ কি শুধু গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতির ফল ছিল, নাকি হাতে থাকা তথ্যের অর্থ বুঝতে ও সময়মতো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা কাঠামো?
সেদিন আল-কায়েদার আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন ২ হাজার ৯৭৭ জন। নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা করেন ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’। শুরু হয় আফগানিস্তান অভিযান, পরে ইরাক যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের রাজনৈতিক, সামরিক ও মানবিক অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বহু বছর ধরে।
কিন্তু ৯/১১-এর ২৫ বছর পর ফিরে তাকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে—তথ্য ছিল, তাহলে ব্যর্থতা কোথায় ছিল?
তথ্য ছিল, কিন্তু এক জায়গায় ছিল না
৯/১১-এর আগে থেকেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে জানত। এমনকি বিন লাদেনকে ধরতে বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ৯/১১ কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, সমস্যা শুধু তথ্যের ঘাটতি ছিল না; বড় সমস্যা ছিল বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং হুমকির প্রকৃতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে না পারা।
অর্থাৎ, একেকটি সংস্থার হাতে ছিল একেকটি তথ্যের টুকরো—কিন্তু সেই টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে আসন্ন বিপদের পূর্ণ চিত্র তৈরি করা যায়নি।
এই ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির কাঠামো জোরদার করে। গড়ে ওঠে ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টার ও ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের মতো প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ আইজ’ জোটও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করে।
তবু ব্যর্থতার গল্প থামেনি।
৯/১১-এর পরও ভুলের পুনরাবৃত্তি
২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান চালানোর আগে সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার দাবি করা হয়েছিল। পরে প্রমাণিত হয়, সেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল ত্রুটিপূর্ণ।
ইরাক যুদ্ধের পর ব্রিটিশ গোয়েন্দা ব্যবস্থায় তথ্য যাচাই ও মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়। তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্য যাচাই ও চ্যালেঞ্জ করার দায়িত্ব আলাদা করা হয়। কিন্তু ইরাকে দায়িত্ব পালন করা ব্রিটিশ জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফের মতে, ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ওপর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সেখান থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নেওয়া হয়নি।
এখানেই ৯/১১-এর শিক্ষার সঙ্গে ইরাকের অভিজ্ঞতার মিল—তথ্য থাকা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এক বিষয় নয়।
লন্ডন থেকে ম্যানচেস্টার—হুমকি বদলেছে
২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে আত্মঘাতী বোমা হামলার আগেও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-এর কাছে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী মোহাম্মদ সিদ্দিক খানের বিষয়ে তথ্য ছিল। কিন্তু তিনি হামলা চালাতে যাচ্ছেন—এটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ওই হামলায় নিহত হন ৫২ জন।
২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা হামলাও গোয়েন্দা ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।
তবে গত ২৫ বছরে হুমকির চরিত্র বদলে গেছে। সাবেক এমআই৫ প্রধান লর্ড জোনাথন ইভান্সের মতে, অ-রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ এখনও বড় হুমকি হলেও রাশিয়া, ইরান, তাদের মিত্রগোষ্ঠী এবং চীনের মতো রাষ্ট্রীয় শক্তির ঝুঁকি এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সন্ত্রাসের পেছনে ছুটতে গিয়ে বড় শক্তির উত্থান
৯/১১-এর পর প্রায় দুই দশক পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বড় অংশের মনোযোগ ছিল সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহ দমনে। সাবেক এমআই৬ প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ংগারের মতে, এর ফলে চীনের সামরিক উত্থান ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
এই সময়ের মধ্যেই রাশিয়া ও চীন সামরিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়িয়েছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ নতুন প্রযুক্তি ন্যাটোর দীর্ঘদিনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে।
চীনকে ঘিরেও পশ্চিমা মূল্যায়নে বড় ধরনের ভুল ছিল। একসময় ধারণা করা হয়েছিল, অর্থনৈতিকভাবে চীনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠলে দেশটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমের কাছাকাছি আসবে। বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো।
এখন সমস্যা তথ্যের অভাব নয়, তথ্যের অর্থ বোঝা
আজ চীন যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অন্যতম প্রধান গোয়েন্দা লক্ষ্য। কিন্তু বিপুল তথ্য সংগ্রহ করেও তার সামগ্রিক কৌশলগত অর্থ বোঝা কঠিন।
কারণ চীনের শক্তি শুধু সেনাবাহিনী বা অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, ব্যাটারি, বন্দর, টেলিযোগাযোগ ও শিল্প সক্ষমতাও দেশটির কৌশলগত শক্তির অংশ।
ফলে আধুনিক গোয়েন্দা ব্যর্থতার সংজ্ঞাও বদলেছে। তথ্য না পাওয়া যেমন সমস্যা, তেমনি হাজার হাজার তথ্যের ভিড়ে কোন তথ্যটি আসল সতর্কবার্তা—তা শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
নিরাপত্তার সঙ্গে মানবাধিকারের সংঘাত
৯/১১-এর পর নতুন হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যাপকভাবে সন্দেহভাজনদের আটক করে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে অনেককে গ্রেপ্তার করে গুয়ানতানামো বে-তে পাঠানো হয়।
বিচার ছাড়াই দীর্ঘদিন আটক, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র সমালোচনা করে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হেফাজতে বন্দিদের নির্যাতনের ঘটনাও পরে প্রকাশ্যে আসে।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধেও লিবীয় ইসলামপন্থী আবদেলহাকিম বেলহাজ ও তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করে লিবিয়ায় পাঠানোর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। ২০১৮ সালে ব্রিটিশ সরকার এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায়।
অর্থাৎ সন্ত্রাস ঠেকানোর নামে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা কোথায়—সেই প্রশ্নটিও ৯/১১-পরবর্তী বিশ্বে বড় হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি দিয়েছে শক্তি, তৈরি করেছে নতুন দুর্বলতাও
গত ২৫ বছরে গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বিপুলভাবে বেড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মুখমণ্ডল ও আইরিস শনাক্তকরণ এবং চলাফেরার ধরন বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
কিন্তু প্রযুক্তি একই সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। গোয়েন্দা এজেন্টদের পরিচয় গোপন রাখা, সীমান্ত অতিক্রম কিংবা নজরদারি এড়িয়ে চলা আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে।
অর্থাৎ যে প্রযুক্তি রাষ্ট্রকে আরও বেশি দেখতে সাহায্য করছে, সেই প্রযুক্তিই প্রতিপক্ষকেও নতুন কৌশল শেখাচ্ছে।
২৫ বছর পরও একই শিক্ষা
৯/১১-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত একটাই—গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করাই শেষ কথা নয়; সেই তথ্যের অর্থ বোঝা, বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করা এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়াই আসল পরীক্ষা।
ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন প্রত্যাহার, ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার মতো ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, গোয়েন্দা ব্যর্থতা কেবল তথ্যের ঘাটতি থেকে তৈরি হয় না। রাজনৈতিক চাপ, ভুল মূল্যায়ন, সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং কৌশলগত আত্মতুষ্টিও বিপদ ডেকে আনতে পারে।
তাই ৯/১১-এর ২৫ বছর পূর্তি শুধু একটি ভয়াবহ দিনের স্মরণ নয়। এটি গোয়েন্দা ব্যবস্থার জন্যও একটি আয়না।
বিশ্ব যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যসমৃদ্ধ ও পরস্পরনির্ভর হচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে একটি পুরোনো প্রশ্ন—বিপদের সংকেত চোখের সামনে থাকলেও আমরা কি তার অর্থ বুঝতে পারছি?
৯/১১-এর ২৫ বছর পরও সেই প্রশ্নের উত্তর পুরোপুরি মেলেনি।

নিজস্ব প্রতিবেদক 


























