বাজারে পণ্যের অভাব একদিকে, অন্যদিকে বাড়তি দাম। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণের পরও রাজধানীর খুচরা বাজারে সংকট কাটেনি। অনেক দোকানে এক লিটারের বোতল মিলছে না; কোথাও আবার পুরোনো দামের তেলও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ডিম, মুরগি, মাছ-মাংস, চিনি, আটা ও ময়দার চড়া দামে সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর, কারওয়ান বাজার, মিরপুর, মহাখালী, খিলক্ষেত ও আশপাশের বাজারের চিত্রে এমন অস্বস্তিই উঠে এসেছে। বাজারে সবজির কিছুটা সরবরাহ বাড়ায় কয়েকটি পণ্যের দাম কমলেও নিত্যপণ্যের সামগ্রিক চাপে সেই স্বস্তি যেন চাপা পড়ে গেছে।
দাম বাড়ল, তবু তেলের দেখা নেই
ভোজ্যতেলের বাজারই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৪ টাকা করা হয়েছে। খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম অবশ্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
কিন্তু নতুন দাম নির্ধারণের পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে অধিকাংশ দোকানে এক লিটারের বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। দুই ও পাঁচ লিটারের বোতল তুলনামূলকভাবে মিললেও ছোট বোতলের সংকট বেশি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। একাধিকবার অর্ডার দিয়েও অল্প পরিমাণ পণ্য পাওয়া যাচ্ছে। নতুন দামের তেল বাজারে পর্যাপ্ত না আসায় কোম্পানিগুলোও স্বাভাবিকভাবে অর্ডার নিচ্ছে না বলে অভিযোগ খুচরা ব্যবসায়ীদের।
ফলে ভোক্তার প্রশ্ন—দাম বাড়ানোর পর যদি পণ্যই না মেলে, তাহলে বাজার ব্যবস্থাপনায় সমস্যাটা কোথায়?
ডিম-মুরগিতে বাড়তি চাপ
নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রোটিনের অন্যতম উৎস ডিম। কিন্তু এই পণ্যের দামও দীর্ঘদিন ধরে চড়া। রাজধানীর বাজারে প্রতি ডজন ডিম প্রায় ১৫০ টাকা, অর্থাৎ হালি ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরেই এই দামে ডিম বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
মুরগির বাজারেও স্বস্তি নেই। ব্রয়লার মুরগি বাজারভেদে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ফের কেজিতে ২০০ টাকার ঘরে উঠেছে দাম। সোনালি মুরগির দাম ৩০০ থেকে ৩৪০ টাকা পর্যন্ত। ফলে কম দামে পরিবারের আমিষের চাহিদা মেটানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ছে।
মাছ-মাংসও নাগালের বাইরে
মাছের বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন নেই। তেলাপিয়া ২২০–২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০–২৫০ টাকা এবং রুই-কাতল ৩৫০–৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম আকার ও মানভেদে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। ইলিশের দামও আকারভেদে দুই হাজার টাকার ওপরে উঠেছে।
মাংসের বাজারে গরুর মাংস ৭৫০–৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ১৫০–১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের খাবারের তালিকা থেকে মাছ-মাংস বাদ পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সবজিতে কিছুটা স্বস্তি, পুরো বাজারে নয়
সবজির বাজারে অবশ্য কিছুটা স্বস্তির খবর আছে। সরবরাহ বাড়ায় পটল, ঢেঁড়স, চিচিঙ্গা, ঝিঙে, পেঁপে, শসাসহ কয়েকটি সবজির দাম কমেছে। পেঁপে ৩০–৪০ টাকা, পটল ও ঢেঁড়স ৫০–৬০ টাকা, শসা ৫০–৬০ টাকা, ঝিঙে ৭০–৮০ টাকা এবং করলা প্রায় ৭০–৮০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
তবে সবজির বাজার পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। বেগুন ৮০–১২০ টাকা, টমেটো ১০০–১৫০ টাকা এবং শিম ১৮০–২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কাঁচা মরিচও মানভেদে ৮০–১৬০ টাকা কেজি। অর্থাৎ কয়েকটি সবজির দাম কমলেও বাজারের বড় অংশে এখনো বাড়তি চাপ রয়েছে।
চিনি-আটা-ময়দাতেও অস্বস্তি
শুধু কাঁচাবাজার নয়, মুদি পণ্যের বাজারেও চাপ বাড়ছে। প্যাকেটজাত আটা প্রতি কেজি প্রায় ৬৫ টাকা, যা কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় বেশি। খোলা ময়দা ৬৫–৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৭০–৭৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চিনির দামও বেড়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১২০–১২৫ টাকা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়ছে। কিছু বাজারে সরবরাহ কমার কথাও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ক্রেতার বাজেটেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা
বাজারে এসে ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে ব্যয় বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল, ডিম, সবজি—সব মিলিয়ে মাসের বাজেট ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। মাছ-মাংসের দাম বাড়তি থাকায় অনেক পরিবার এসব পণ্য কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ হওয়ায় কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতারা কেনাকাটা কমিয়ে দেওয়ায় বিক্রেতাদেরও বিক্রি ও মুনাফা কমছে।
সংকটের মূল জায়গায় নজরদারি
বাজারের এই মিশ্র চিত্র বলছে, শুধু কোনো একটি পণ্যের দাম কমলেই স্বস্তি ফিরবে না। কোথাও সরবরাহ সংকট, কোথাও আমদানি ব্যয়, কোথাও পাইকারি-খুচরা দামের ব্যবধান—সব মিলিয়ে বাজারে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রে দাম সমন্বয়ের পাশাপাশি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে মূল্যতালিকা কার্যকর করা, অস্বাভাবিক মুনাফা ও কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ তদন্ত করা এবং নিয়মিত বাজার তদারকি বাড়ানোর দাবি ক্রেতাদের।
কারণ বাজারে এখন শুধু প্রশ্ন ‘দাম কত?’ নয়—আরও বড় প্রশ্ন, ‘দাম দিয়েও পণ্যটি পাওয়া যাবে তো?’

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















