০২:০২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জলবায়ু, মহামারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নগরায়ণের চাপে বদলে যাচ্ছে মানুষের নিরাপত্তার সংজ্ঞা

The gallery was not found!

সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারের মানুষের মনে যে প্রশ্নটি স্বাভাবিক—‘কখন ফিরবে?’—তার সঙ্গে এখন যেন আরেকটি প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে, ‘নিরাপদে ফিরবে তো?’ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে বের হলেই সামনে নানা ধরনের ঝুঁকি। সড়ক দুর্ঘটনা, অপরাধ, অগ্নিকাণ্ড, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কিংবা নগর অব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নটি নাগরিক জীবনের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

ঘরে থাকলেও মানুষ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরি, সাইবার অপরাধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিরাপত্তার নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপ, সংক্রামক রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং দ্রুত নগরায়ণের মতো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।

অর্থাৎ নিরাপত্তা এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সামগ্রিক প্রশ্ন।

এক শহর, বহু ঝুঁকি

ব্যস্ত নগরজীবনে প্রতিদিন মানুষকে অসংখ্য ঝুঁকির মধ্য দিয়ে চলতে হয়। কোন পথে যাওয়া নিরাপদ, কোন যানবাহনে ওঠা যাবে, কোথায় রাস্তা পার হওয়া নিরাপদ, অপরিচিত ফোনে তথ্য দেওয়া ঠিক হবে কি না কিংবা অনলাইনে অর্থ লেনদেন কতটা নিরাপদ—এসব সিদ্ধান্ত এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

সড়কে পথচারীর নিরাপত্তা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, ফুটপাতের ব্যবহার, ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত সেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামান্য দুর্বলতা বড় বিপদ তৈরি করতে পারে।

ভয় যেন স্বাভাবিক হয়ে না যায়

নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় সামাজিক ঝুঁকি হলো মানুষ যদি একসময় বিপদকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। দুর্ঘটনার পর শুধু দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা কিংবা অগ্নিকাণ্ডের পর শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কেন ঘটনা ঘটল, কোথায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল এবং আগেই তা ঠেকানোর সুযোগ ছিল কি না—এই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তার আধুনিক ধারণা তাই প্রতিক্রিয়ার চেয়ে প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী

বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০–২০০৪ থেকে ২০১৭–২০২১ সময়ের মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের তাপজনিত মৃত্যুহার প্রায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে চরম তাপের সংস্পর্শে আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

অতিরিক্ত তাপ শুধু অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায় না। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ কর্মক্ষমতা কমাতে পারে, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর একই সময়ে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

ভবিষ্যতের শহরে তাই শুধু ভবন ও সড়ক নয়, তাপ মোকাবিলার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের সামনে বাড়তি চাপ

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য আরও বড়। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বন্যার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও রোগের পরিবর্তিত ধরন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, বসতি ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকেও একইভাবে সমন্বিত হতে হবে।

মহামারির ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি

কোভিড-১৯ দেখিয়েছে, একটি সংক্রামক রোগ কীভাবে হাসপাতালের গণ্ডি পেরিয়ে অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। WHO-এর ২০২৫ সালের আলোচনায়ও ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরেকটি নীরব ঝুঁকি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। WHO-এর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে ১০৪টি দেশের ২০২৩ সালের তথ্যসহ ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি পরীক্ষাগার-নিশ্চিত সংক্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি ছয়টি পরীক্ষাগার-নিশ্চিত ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় একটি প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল।

এর অর্থ ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যনিরাপত্তায় শুধু নতুন রোগ নয়, বিদ্যমান রোগের চিকিৎসা কার্যকর রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।

শহর যত বাড়বে, পরীক্ষাও তত বাড়বে

জাতিসংঘের World Urbanization Prospects 2025 অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শহরে বাস করে। ২০৫০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শহরে ঘটবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে আবাসন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়বে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাও এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। জাতিসংঘের একই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগর সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি।

ভবিষ্যতের নিরাপদ শহর তাই শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়কের শহর হবে না। নিরাপদ পানি, কার্যকর নিষ্কাশনব্যবস্থা, তাপ মোকাবিলার সবুজ অবকাঠামো, নিরাপদ গণপরিবহন এবং জরুরি সেবার দ্রুত সক্ষমতাও শহরের নিরাপত্তার অংশ হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: নতুন সুযোগ, নতুন প্রশ্ন

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তার সংজ্ঞায় আরেকটি বড় পরিবর্তন আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Global Risks Report 2026-এ ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে স্বল্পমেয়াদি বড় ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে AI-এর সম্ভাব্য বিরূপ ফলাফলকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

AI-এর ঝুঁকি শুধু ভুয়া তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাইবার নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত এবং মানুষের তৈরি তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে যাচাই করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো অনিবার্য বিপর্যয় নয়। বরং এর নিরাপদ ব্যবহার, স্বচ্ছতা, মানবিক তদারকি ও দায়িত্বশীল নীতিমালা কতটা কার্যকর হয়—সেটিই বড় প্রশ্ন।

তাহলে ভবিষ্যৎ কী?

বিজ্ঞান ভবিষ্যৎকে কোনো একক ও অবধারিত বিপর্যয়ের ছবি হিসেবে দেখছে না। বরং গবেষণা বলছে, ঝুঁকি বাড়লেও প্রস্তুতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে তার প্রভাব কমানো সম্ভব।

ভবিষ্যতের মানবনিরাপত্তার ভিত্তি তাই একাধিক স্তরে তৈরি করতে হবে—জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মহামারি নজরদারি, অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিরাপদ নগর পরিকল্পনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল প্রয়োগ।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হতে পারে চিন্তার জায়গায়। নিরাপত্তা মানে শুধু বিপদ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বিপদ কোথায় তৈরি হতে পারে, সেটি আগে শনাক্ত করে প্রস্তুতি নেওয়া।

বিজ্ঞানের বার্তা তাই আতঙ্কের নয়, সতর্কতার। ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, নগরায়ণ ও প্রযুক্তি মানুষের সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে—কিন্তু সেই ঝুঁকির মাত্রা ও ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আজকের প্রস্তুতির ওপর।

আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই পৃথিবী নিরাপদ থাকবে কি না—শুধু তা নয়। আসল প্রশ্ন, পরিবর্তিত পৃথিবীর জন্য মানুষ কতটা প্রস্তুত থাকবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর
Business Times24

জলবায়ু, মহামারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নগরায়ণের চাপে বদলে যাচ্ছে মানুষের নিরাপত্তার সংজ্ঞা

Update Time : ০৯:৫৬:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারের মানুষের মনে যে প্রশ্নটি স্বাভাবিক—‘কখন ফিরবে?’—তার সঙ্গে এখন যেন আরেকটি প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে, ‘নিরাপদে ফিরবে তো?’ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে বের হলেই সামনে নানা ধরনের ঝুঁকি। সড়ক দুর্ঘটনা, অপরাধ, অগ্নিকাণ্ড, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কিংবা নগর অব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্নটি নাগরিক জীবনের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

ঘরে থাকলেও মানুষ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরি, সাইবার অপরাধ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিরাপত্তার নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অতিরিক্ত তাপ, সংক্রামক রোগ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং দ্রুত নগরায়ণের মতো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।

অর্থাৎ নিরাপত্তা এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়। এটি স্বাস্থ্য, পরিবেশ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সামগ্রিক প্রশ্ন।

এক শহর, বহু ঝুঁকি

ব্যস্ত নগরজীবনে প্রতিদিন মানুষকে অসংখ্য ঝুঁকির মধ্য দিয়ে চলতে হয়। কোন পথে যাওয়া নিরাপদ, কোন যানবাহনে ওঠা যাবে, কোথায় রাস্তা পার হওয়া নিরাপদ, অপরিচিত ফোনে তথ্য দেওয়া ঠিক হবে কি না কিংবা অনলাইনে অর্থ লেনদেন কতটা নিরাপদ—এসব সিদ্ধান্ত এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

সড়কে পথচারীর নিরাপত্তা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, ফুটপাতের ব্যবহার, ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত সেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামান্য দুর্বলতা বড় বিপদ তৈরি করতে পারে।

ভয় যেন স্বাভাবিক হয়ে না যায়

নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় সামাজিক ঝুঁকি হলো মানুষ যদি একসময় বিপদকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। দুর্ঘটনার পর শুধু দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা কিংবা অগ্নিকাণ্ডের পর শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। কেন ঘটনা ঘটল, কোথায় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল এবং আগেই তা ঠেকানোর সুযোগ ছিল কি না—এই প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তার আধুনিক ধারণা তাই প্রতিক্রিয়ার চেয়ে প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী

বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০–২০০৪ থেকে ২০১৭–২০২১ সময়ের মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের তাপজনিত মৃত্যুহার প্রায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে চরম তাপের সংস্পর্শে আসা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।

অতিরিক্ত তাপ শুধু অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ায় না। দীর্ঘ তাপপ্রবাহ কর্মক্ষমতা কমাতে পারে, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপর একই সময়ে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

ভবিষ্যতের শহরে তাই শুধু ভবন ও সড়ক নয়, তাপ মোকাবিলার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের সামনে বাড়তি চাপ

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য আরও বড়। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বন্যার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও রোগের পরিবর্তিত ধরন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। পানি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, বসতি ও জীবিকার ওপর এর প্রভাব একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকেও একইভাবে সমন্বিত হতে হবে।

মহামারির ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি

কোভিড-১৯ দেখিয়েছে, একটি সংক্রামক রোগ কীভাবে হাসপাতালের গণ্ডি পেরিয়ে অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। WHO-এর ২০২৫ সালের আলোচনায়ও ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরেকটি নীরব ঝুঁকি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। WHO-এর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে ১০৪টি দেশের ২০২৩ সালের তথ্যসহ ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি পরীক্ষাগার-নিশ্চিত সংক্রমণের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রতি ছয়টি পরীক্ষাগার-নিশ্চিত ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের প্রায় একটি প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ছিল।

এর অর্থ ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যনিরাপত্তায় শুধু নতুন রোগ নয়, বিদ্যমান রোগের চিকিৎসা কার্যকর রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।

শহর যত বাড়বে, পরীক্ষাও তত বাড়বে

জাতিসংঘের World Urbanization Prospects 2025 অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ শহরে বাস করে। ২০৫০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শহরে ঘটবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে আবাসন, পানি, পয়োনিষ্কাশন, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়বে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাও এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। জাতিসংঘের একই তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগর সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি।

ভবিষ্যতের নিরাপদ শহর তাই শুধু উঁচু ভবন বা প্রশস্ত সড়কের শহর হবে না। নিরাপদ পানি, কার্যকর নিষ্কাশনব্যবস্থা, তাপ মোকাবিলার সবুজ অবকাঠামো, নিরাপদ গণপরিবহন এবং জরুরি সেবার দ্রুত সক্ষমতাও শহরের নিরাপত্তার অংশ হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: নতুন সুযোগ, নতুন প্রশ্ন

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তার সংজ্ঞায় আরেকটি বড় পরিবর্তন আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Global Risks Report 2026-এ ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে স্বল্পমেয়াদি বড় ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে AI-এর সম্ভাব্য বিরূপ ফলাফলকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

AI-এর ঝুঁকি শুধু ভুয়া তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাইবার নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন, স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত এবং মানুষের তৈরি তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে যাচাই করার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কোনো অনিবার্য বিপর্যয় নয়। বরং এর নিরাপদ ব্যবহার, স্বচ্ছতা, মানবিক তদারকি ও দায়িত্বশীল নীতিমালা কতটা কার্যকর হয়—সেটিই বড় প্রশ্ন।

তাহলে ভবিষ্যৎ কী?

বিজ্ঞান ভবিষ্যৎকে কোনো একক ও অবধারিত বিপর্যয়ের ছবি হিসেবে দেখছে না। বরং গবেষণা বলছে, ঝুঁকি বাড়লেও প্রস্তুতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে তার প্রভাব কমানো সম্ভব।

ভবিষ্যতের মানবনিরাপত্তার ভিত্তি তাই একাধিক স্তরে তৈরি করতে হবে—জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মহামারি নজরদারি, অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিরাপদ নগর পরিকল্পনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল প্রয়োগ।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হতে পারে চিন্তার জায়গায়। নিরাপত্তা মানে শুধু বিপদ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বিপদ কোথায় তৈরি হতে পারে, সেটি আগে শনাক্ত করে প্রস্তুতি নেওয়া।

বিজ্ঞানের বার্তা তাই আতঙ্কের নয়, সতর্কতার। ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, নগরায়ণ ও প্রযুক্তি মানুষের সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে—কিন্তু সেই ঝুঁকির মাত্রা ও ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে আজকের প্রস্তুতির ওপর।

আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই পৃথিবী নিরাপদ থাকবে কি না—শুধু তা নয়। আসল প্রশ্ন, পরিবর্তিত পৃথিবীর জন্য মানুষ কতটা প্রস্তুত থাকবে।