ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দনবাসে রাশিয়ার সামরিক চাপ আরও তীব্র হয়েছে। অঞ্চলটির ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত অংশের গুরুত্বপূর্ণ দুই শহর স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক এখন রুশ হামলার প্রধান লক্ষ্য। প্রতিদিনই বাড়ছে ড্রোন ও গ্লাইড বোমা হামলা। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে শহর দুটির বেসামরিক বাসিন্দাদের দ্রুত সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউক্রেনীয় পুলিশ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে শিশু থাকা পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে। দোনেৎস্ক পুলিশের কর্মকর্তা পাভলো দিয়াচেঙ্কো বলেন, পরিস্থিতি এতটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে যে জীবন বাঁচাতে শহর ছেড়ে যাওয়াই এখন সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
স্লোভিয়ানস্কে আগে সপ্তাহে একবারের মতো গ্লাইড বোমা হামলা হলেও এখন প্রায় প্রতিদিনই হামলা হচ্ছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ড্রোন ঠেকাতে জাল টাঙানো হয়েছে। রিমোট-নিয়ন্ত্রিত এফপিভি ড্রোনের উপস্থিতিও নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। ফলে শহরের ভেতরে গাড়ি চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
স্লোভিয়ানস্ক, ক্রামাতোরস্ক ও কোস্তিয়ানতিনিভকা নিয়ে গঠিত এলাকাটি ইউক্রেনের ‘ফোর্ট্রেস বেল্ট’ বা দুর্গ বলয়ের অংশ। শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল ইউক্রেনের প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে কোস্তিয়ানতিনিভকায় ইউক্রেনীয় সেনাদের উপস্থিতি কমে এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। রাশিয়া আবার শহরটির পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে।
দনবাসের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক—দুই অঞ্চলই রাশিয়ার সামরিক পরিকল্পনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লুহানস্কের প্রায় পুরো অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দোনেৎস্কের প্রায় ৮০ শতাংশ তাদের দখলে। ফলে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা দোনেৎস্কের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো দখল করতে পারলে পুরো দনবাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ অনেকটাই সহজ হবে।
গত কয়েক মাসে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের আশপাশে রুশ স্থল হামলা বেড়েছে। একই সঙ্গে তীব্র হয়েছে আকাশপথের হামলা। ইউক্রেনীয় পুলিশের হিসাবে, জুনে শহর দুটিতে রুশ হামলায় ৭০ জন বেসামরিক আহত হন। জুলাই ও আগস্টে আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২১২ জন করে। নিহত হন জুনে ১৬ জন, জুলাইয়ে ২০ জন এবং আগস্টে ১৫ জন।
গ্লাইড বোমার ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জুনে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কে ৪০টি গ্লাইড বোমা নিক্ষেপ করা হলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে ১০৯টিতে পৌঁছায়। আগস্টে নিক্ষেপ করা হয় আরও ৯২টি।
গত ২৫ আগস্ট ক্রামাতোরস্কে একসঙ্গে নয়টি গ্লাইড বোমা হামলা হয়। এর সাতটি বেসামরিক অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে আঘাত হানে। এতে দুই মাস বয়সী এক শিশুসহ ২৪ জন আহত হন। ২৭ আগস্ট আবারও হামলা হয়। ওই দিন ক্রামাতোরস্কে সাতটি এবং স্লোভিয়ানস্কে পাঁচটি গ্লাইড বোমা নিক্ষেপ করা হয়।
গ্লাইড বোমা সাধারণত ডানা বা পাখনার সাহায্যে দূর থেকে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারে। রাশিয়া ২৫০ ও ৫০০ কেজি ওজনের পাশাপাশি ১ হাজার ৫০০ কেজি ওজনের বোমাও ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব বোমার আঘাতে ব্যাপক ধ্বংস হচ্ছে।
এদিকে দনবাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের বৈঠকে দনবাসের ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত অংশ গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে। এর আগে তাঁরা রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও আলোচনা করেন।
জেলেনস্কি দনবাস থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, দনবাস দখল সম্পন্ন করতে পুতিন রুশ সেনা নেতৃত্বকে চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছেন। রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইউক্রেনও দনবাসে দুটি নতুন টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
সব মিলিয়ে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক ঘিরে সামরিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এই দুই শহরের নিয়ন্ত্রণ শুধু দনবাসের ভবিষ্যৎ নয়, ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী গতিপথেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 


























