১০:৪০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

হরমুজে চার দেশের জাহাজে ইরানের ছাড়, তেলের পথ খুলে কূটনৈতিক হিসাব

The gallery was not found!

ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে বিশেষ অনুমতি • ট্রানজিট ফি ও রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের কৌশল • যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে নতুন প্রশ্ন

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে বিশেষ ছাড় দিয়েছে ইরান। যুদ্ধের কারণে নৌপথটি কার্যত বন্ধ থাকলেও চার দেশের জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়ে তেহরান অর্থনৈতিক সুবিধা, রাজনৈতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকায় এই ছাড় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দাম এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, চার দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আরোপ করা বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে তাদের চলাচল পুরোপুরি নির্বিঘ্ন হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যাহত হয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন করা জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।

ছাড়ের বিনিময়ে কী পাচ্ছে ইরান?

ইরানের আইনপ্রণেতা হায়াত মোকাদ্দামের মতে, ভারত থেকে ওষুধ এবং চীন থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে তেহরানের। ভারত ও চীনের জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় করা হতে পারে। তবে কাতারের জাহাজ বিনা ফিতে চলাচল করতে পারবে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে মাশুলের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইরান উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করতে পারে। দেশটির অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ফলে চীনা জাহাজের চলাচল সহজ করা তেহরানের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

চার দেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত, চীন, কাতার ও ইরাক—সব দেশই জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ১ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছে। এর প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।

ভারতের জন্য উপসাগরীয় তেল সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশটি ইরানের প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় উৎপাদক। কাতারের জন্য প্রণালিটি এলএনজি রপ্তানির প্রধান পথ। ইরাকের তেল পরিবহনেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে কতটা কার্যকর হবে ছাড়?

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও বন্দর থেকে প্রবেশ কিংবা বের হওয়া সব দেশের জাহাজের ওপর অবরোধ প্রযোজ্য। তবে ইরানের বন্দর এড়িয়ে চলা জাহাজের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কার্যকর হবে না। খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী জাহাজ তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।

বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, ছাড়ের আওতায় জাহাজ বলতে নিবন্ধিত পতাকা, মালিকানা, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাকি অন্য কোনো সংশ্লিষ্টতা বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগ মেনে নিলে চীন ও ভারতের জাহাজের চলাচলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

তেলবাজারে প্রভাব সীমিত

বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত এই ছাড় বিশ্ব তেলবাজারে বড় পরিবর্তন আনবে না। বাজারের নজর এখন বৃহত্তর শান্তিচুক্তির সম্ভাবনার দিকে। ইরান অবরোধ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে।

তবে ছাড় পেলেই জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে বহু বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও জরুরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

হরমুজে চার দেশের জাহাজে ইরানের ছাড়, তেলের পথ খুলে কূটনৈতিক হিসাব

Business Times24

হরমুজে চার দেশের জাহাজে ইরানের ছাড়, তেলের পথ খুলে কূটনৈতিক হিসাব

Update Time : ১০:১০:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে বিশেষ অনুমতি • ট্রানজিট ফি ও রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের কৌশল • যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে নতুন প্রশ্ন

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে বিশেষ ছাড় দিয়েছে ইরান। যুদ্ধের কারণে নৌপথটি কার্যত বন্ধ থাকলেও চার দেশের জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়ে তেহরান অর্থনৈতিক সুবিধা, রাজনৈতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকায় এই ছাড় কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মোকাদ্দাম এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, চার দেশের জাহাজ হরমুজ প্রণালিতে আরোপ করা বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পেয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে তাদের চলাচল পুরোপুরি নির্বিঘ্ন হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল ব্যাহত হয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন করা জ্বালানি তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।

ছাড়ের বিনিময়ে কী পাচ্ছে ইরান?

ইরানের আইনপ্রণেতা হায়াত মোকাদ্দামের মতে, ভারত থেকে ওষুধ এবং চীন থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে তেহরানের। ভারত ও চীনের জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় করা হতে পারে। তবে কাতারের জাহাজ বিনা ফিতে চলাচল করতে পারবে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে মাশুলের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইরান উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করতে পারে। দেশটির অপরিশোধিত তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। ফলে চীনা জাহাজের চলাচল সহজ করা তেহরানের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।

চার দেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারত, চীন, কাতার ও ইরাক—সব দেশই জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে এই পথ দিয়ে প্রতিদিন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ১ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হয়েছে। এর প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।

ভারতের জন্য উপসাগরীয় তেল সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দেশটি ইরানের প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় উৎপাদক। কাতারের জন্য প্রণালিটি এলএনজি রপ্তানির প্রধান পথ। ইরাকের তেল পরিবহনেও এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধে কতটা কার্যকর হবে ছাড়?

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও বন্দর থেকে প্রবেশ কিংবা বের হওয়া সব দেশের জাহাজের ওপর অবরোধ প্রযোজ্য। তবে ইরানের বন্দর এড়িয়ে চলা জাহাজের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কার্যকর হবে না। খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী জাহাজ তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।

বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, ছাড়ের আওতায় জাহাজ বলতে নিবন্ধিত পতাকা, মালিকানা, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নাকি অন্য কোনো সংশ্লিষ্টতা বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্র এই উদ্যোগ মেনে নিলে চীন ও ভারতের জাহাজের চলাচলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

তেলবাজারে প্রভাব সীমিত

বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত এই ছাড় বিশ্ব তেলবাজারে বড় পরিবর্তন আনবে না। বাজারের নজর এখন বৃহত্তর শান্তিচুক্তির সম্ভাবনার দিকে। ইরান অবরোধ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে।

তবে ছাড় পেলেই জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে বহু বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল স্বাভাবিক করতে কূটনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও জরুরি।