যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে প্রতিপক্ষকে আগের চেয়ে বেশি মূল্য দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, চলতি বছরের যুদ্ধের পর ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা হয়েছে। নতুন অস্ত্র, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশল নিয়ে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুত তেহরান। এবার যুদ্ধ শুরু হলে তা দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ আবারও শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘খুব শিগগির, যেকোনোভাবে’ শেষ হবে। তবে তেহরানকে একটি চুক্তিতে রাজি হতে হবে, অন্যথায় কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হোসেইন কানানি মোগাদ্দাম আল–জাজিরাকে বলেন, আগের হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হলেও বর্তমানে তাদের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বেড়েছে।
তাঁর ভাষ্য, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, নির্ভুলতা ও ওয়ারহেডের সক্ষমতা উন্নত হয়েছে। ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন সক্ষমতা অর্জন করেছে ইরান। শত্রুপক্ষের নতুন সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম শনাক্ত করা হচ্ছে এবং বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানিয়েছেন, আবার হামলা হলে আগে প্রকাশ করা হয়নি—এমন সামরিক সক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সামনে আনা হবে। সেগুলো প্রয়োগের প্রস্তুতিও রয়েছে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ, আইআরজিসি ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা সম্প্রতি সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সম্ভাব্য হামলার জবাব কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইরানের প্রতিক্রিয়া হবে তাৎক্ষণিক এবং সংঘাত পশ্চিম এশিয়ার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, আরেকটি হামলা মোকাবিলায় বাহিনী ‘১০০ শতাংশ প্রস্তুত’। অন্যদিকে আকরামিনিয়া জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের শ্রেষ্ঠত্বের ঘাটতি পুষিয়ে নিতে অসম যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করা হবে।
জুনে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর ইরানের সামরিক বাহিনী অস্ত্র সংস্কার, নতুন সরঞ্জাম সংযোজন ও কৌশলগত পরিবর্তন করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত মাসে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ভূগর্ভের একটি ড্রোন উৎপাদনকেন্দ্রের চিত্র দেখানো হয়। কর্তৃপক্ষ আরাশ অ্যাটাক ড্রোনের উন্নত সংস্করণও প্রদর্শন করে। তাদের দাবি, ড্রোনটির ওয়ারহেডের ওজন দ্বিগুণ করে ১০০ কেজি করা হয়েছে এবং নিশানা নির্ধারণের ব্যবস্থাও উন্নত করা হয়েছে।
এদিকে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সামরিক সংস্থা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আমদানি করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত চীন, রাশিয়া ও জার্মানি থেকে রকেটের জ্বালানি, বিস্ফোরক, টাইটানিয়াম ও ভারী ট্রাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম আনা হয়েছে।
ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও রাডারব্যবস্থা পুনর্গঠনের পাশাপাশি সচল ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো হচ্ছে।
তবে সম্ভাব্য যুদ্ধের ঝুঁকি শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, তেল-গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানা, সড়ক এবং রেলপথ হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এতে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র ও আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ইসমাইল কৌসারি বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা ও অন্য নেতাদের হত্যা করলেও শত্রুপক্ষ তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তাঁর দাবি, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো এবং দেশটিকে খণ্ডবিখণ্ড করাই ছিল প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য।
সব মিলিয়ে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কায় ইরান সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। তবে সংঘাত আবার শুরু হলে তার প্রভাব সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবন, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















