দেশের আর্থিক খাতকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল করতে বড় ধরনের সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেবে সংস্থাটি। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি বাড়ানো এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নিতে এ অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে ‘আর্থিক খাত সহায়তা প্রকল্প-২’ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুক্রবার রাজধানীর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) এ চুক্তি সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশের পক্ষে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষে সংস্থাটির বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার উদ্যোগ
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে ৩২৮ মিলিয়ন স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর) দেওয়া হবে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, এর পরিমাণ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন বা ৪৫ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এর মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। বিশেষ করে আর্থিক খাতের তদারকি কাঠামোকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ
দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংক খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ প্রবাহ সচল রাখতে একটি সুস্থ ও কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল তদারকি, অনিয়ম এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি পুরো অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এ অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের নতুন অর্থায়ন আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা বাড়ানো এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো শক্তিশালী করা গেলে ব্যাংক খাতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হতে পারে।
একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনে সহায়তা প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও উদ্যোগটি গুরুত্ব বহন করছে। তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে অর্থের যথাযথ ব্যবহার, সংস্কারের ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবায়নে কার্যকর তদারকির ওপর।
সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন
ঋণচুক্তির শর্ত অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের ওপর বার্ষিক ১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দিতে হবে। অন্যদিকে, উত্তোলন না করা অর্থের ওপর সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ প্রতিশ্রুতি ফি ধার্য হতে পারে। ঋণ পরিশোধে পাঁচ বছর রেয়াতকালসহ মোট ২৫ বছর সময় পাওয়া যাবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকছে।
বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারসহ বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে অর্থায়ন করে আসছে সংস্থাটি।
সামগ্রিকভাবে, ৪৫ কোটি ডলারের এই ঋণ শুধু আর্থিক খাতে নতুন অর্থের সংস্থান নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















