১২:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, বদলে যাচ্ছে বিশ্বশক্তির সমীকরণ

The gallery was not found!

বিশ্বের দুই পরাশক্তির সম্পর্কের নতুন সমীকরণ সামনে রেখে ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।

তাকে স্বাগত জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগতভাবে জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রুজে উপস্থিত হওয়ার সিদ্ধান্তও এই সফরের গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এক দশকের বেশি সময় পর চীনের কোনো প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় সফর হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সি চিন পিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে বিমানঘাঁটিতে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প। পরদিন হোয়াইট হাউসে হবে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা ও দুই নেতার বৈঠক।

এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আয়োজন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান এবং বিশ্ব রাজনীতিতে দুই দেশের প্রভাবের পরিবর্তিত চিত্রও এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

২০১৬ সালে সি যখন সর্বশেষ ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন, তখন চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষমতার সমীকরণ আজকের মতো ছিল না। এবার ওয়াশিংটনে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উপস্থিতি বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।

বাণিজ্যই আলোচনার কেন্দ্রে

ট্রাম্প-সি বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় হতে পারে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক। শুল্ক, বিরল খনিজ, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেও উভয় পক্ষ সম্পর্ককে আরও অবনতি থেকে ঠেকাতে চাইছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে আসন্ন বৈঠক থেকে বড় কোনো চুক্তির চেয়ে বিদ্যমান বাণিজ্য-সমঝোতা ধরে রাখার সম্ভাবনাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশটির অবস্থানও বেইজিংকে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিচ্ছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীন থেকে বিরল খনিজের সরবরাহ, কৃষিপণ্য কেনা এবং প্রযুক্তি-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও স্থিতিশীলতা।

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ

বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের ইরাননীতি নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এখানে দুই দেশের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চাইলেও চীন মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করবে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান প্রশ্নে চীনের অবস্থান এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর প্রভাবও আলোচনার অংশ হতে পারে।

তাইওয়ান ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা

বাণিজ্যের পাশাপাশি তাইওয়ানও দুই নেতার আলোচনায় স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে থাকবে। চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে সহযোগিতা করে আসছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সি যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানকে অস্ত্র দেওয়ার নীতি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিও নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। চিপ, এআই প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

বদলে যাচ্ছে বিশ্বশক্তির সমীকরণ

সি চিন পিংয়ের এবারের ওয়াশিংটন সফরের তাৎপর্য এখানেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন শুধু বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—তারা বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির প্রধান দুই শক্তি।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনও বিশ্বশক্তির হিসাবকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। ফলে ২০১৬ সালের তুলনায় এবার ওয়াশিংটনে সি চিন পিংয়ের অবস্থান আলাদা।

তবে এই সফরকে সরাসরি ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দুই পরাশক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রেখেও সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছে। আসন্ন বৈঠকে বড় কোনো সমঝোতা না হলেও বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানো, প্রযুক্তিগত সংঘাত নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে অগ্রগতি হলে সেটিই হবে বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ ফল।

সি চিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফর তাই একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাবের ভারসাম্য কীভাবে বদলাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

নিত্যপণ্যের দামে বাজারের বাজেট এলোমেলো

Business Times24

ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, বদলে যাচ্ছে বিশ্বশক্তির সমীকরণ

Update Time : ১১:২৩:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্বের দুই পরাশক্তির সম্পর্কের নতুন সমীকরণ সামনে রেখে ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং।

তাকে স্বাগত জানাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগতভাবে জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রুজে উপস্থিত হওয়ার সিদ্ধান্তও এই সফরের গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এক দশকের বেশি সময় পর চীনের কোনো প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় সফর হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সি চিন পিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে বিমানঘাঁটিতে স্বাগত জানাবেন ট্রাম্প। পরদিন হোয়াইট হাউসে হবে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা ও দুই নেতার বৈঠক।

এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আয়োজন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বর্তমান অবস্থান এবং বিশ্ব রাজনীতিতে দুই দেশের প্রভাবের পরিবর্তিত চিত্রও এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

২০১৬ সালে সি যখন সর্বশেষ ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন, তখন চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষমতার সমীকরণ আজকের মতো ছিল না। এবার ওয়াশিংটনে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত উপস্থিতি বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে।

বাণিজ্যই আলোচনার কেন্দ্রে

ট্রাম্প-সি বৈঠকের অন্যতম প্রধান বিষয় হতে পারে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক। শুল্ক, বিরল খনিজ, প্রযুক্তি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেও উভয় পক্ষ সম্পর্ককে আরও অবনতি থেকে ঠেকাতে চাইছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলোতে আসন্ন বৈঠক থেকে বড় কোনো চুক্তির চেয়ে বিদ্যমান বাণিজ্য-সমঝোতা ধরে রাখার সম্ভাবনাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

চীনের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে দেশটির অবস্থানও বেইজিংকে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিচ্ছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীন থেকে বিরল খনিজের সরবরাহ, কৃষিপণ্য কেনা এবং প্রযুক্তি-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও স্থিতিশীলতা।

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ

বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের ইরাননীতি নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এখানে দুই দেশের স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চাইলেও চীন মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করবে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান প্রশ্নে চীনের অবস্থান এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এর প্রভাবও আলোচনার অংশ হতে পারে।

তাইওয়ান ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা

বাণিজ্যের পাশাপাশি তাইওয়ানও দুই নেতার আলোচনায় স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে থাকবে। চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখতে সহযোগিতা করে আসছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সি যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানকে অস্ত্র দেওয়ার নীতি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিও নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। চিপ, এআই প্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

বদলে যাচ্ছে বিশ্বশক্তির সমীকরণ

সি চিন পিংয়ের এবারের ওয়াশিংটন সফরের তাৎপর্য এখানেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন শুধু বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—তারা বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির প্রধান দুই শক্তি।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনও বিশ্বশক্তির হিসাবকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। ফলে ২০১৬ সালের তুলনায় এবার ওয়াশিংটনে সি চিন পিংয়ের অবস্থান আলাদা।

তবে এই সফরকে সরাসরি ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দুই পরাশক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রেখেও সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছে। আসন্ন বৈঠকে বড় কোনো সমঝোতা না হলেও বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানো, প্রযুক্তিগত সংঘাত নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে অগ্রগতি হলে সেটিই হবে বৈঠকের গুরুত্বপূর্ণ ফল।

সি চিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফর তাই একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্বব্যবস্থায় অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাবের ভারসাম্য কীভাবে বদলাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে।