সাড়ে পাঁচ বছর ধরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার যে ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন ছিল, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে এসে সেই প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং রিজার্ভ বাড়ায় ডলারের ওপর চাপ কমেছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে টাকার বিনিময়মূল্য কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও এ পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে শূন্য দশমিক ০৬ শতাংশ বেড়েছে। এরপর ৩০ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও শূন্য দশমিক ৭৭ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে টাকা। এ সময়ে ডলারের দর ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে কমে ১২৩ টাকায় নেমে আসে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্পট রেফারেন্স রেট অনুযায়ী ২১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা পর্যন্ত ডলারের হার ছিল ১২২ দশমিক ৯৯৫১ টাকা। ১৭ সেপ্টেম্বর একই সময়ের রেফারেন্স রেট ছিল ১২৩ দশমিক ০০৭৮ টাকা। অর্থাৎ সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও ডলারের দর মোটামুটি ১২৩ টাকার আশপাশে রয়েছে।
পাঁচ বছরে বড় পরিবর্তন
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২১ সালে প্রতি ডলারের দর ছিল ৮৫ টাকা ৮০ পয়সা। এরপর কয়েক বছর ধরে ডলারের দর বাড়তে বাড়তে গত ৩০ আগস্ট সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সায় পৌঁছায়। অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ডলারের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৮ টাকা ১৫ পয়সা। এতে ওই সময়ে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়া, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ডলারের দর দ্রুত বেড়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতেও আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও অর্থনৈতিক চাপ টাকার ওপর প্রভাব ফেলে।
এখন পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। দেশে ডলারের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি আমদানি চাহিদার চাপ তুলনামূলক কম থাকায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তারল্য বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাজারে অতিরিক্ত ডলার সরবরাহের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার কিনেছিল।
রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধি
টাকার শক্তিশালী হওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৭ দশমিক ৭০২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনেই প্রবাসীরা দেশে প্রায় ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন। এর আগে আগস্ট মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ২ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
এরও আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এতে আমদানি ও অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংকগুলোর ওপর ডলারের ঘাটতির চাপ আগের তুলনায় কমেছে।
বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) BPM6 পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর শেষে মোট রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে রিজার্ভে বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে BPM6 পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির ফলে আমদানি বিল, জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধের ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা বেড়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে আস্থাও বাড়ছে।
বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা
সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে উভয়মুখী ভূমিকা পালন করছে। ডলারের সরবরাহ বেড়ে দর দ্রুত কমতে থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনেছে। আবার আমদানি পরিশোধের চাহিদা বাড়লে বাজারে ডলার সরবরাহ করতে বিক্রিও করেছে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪ মাসের বেশি সময় পর ছয়টি ব্যাংকের কাছে ১১ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করে। ওই সময়ে আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি দামের চাপের কারণে ডলারের চাহিদা কিছুটা বাড়ছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, বাজারে বিনিময় হারকে একটি স্থিতিশীল পরিসরে রাখার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ডলার সরবরাহের কারণে টাকার মূল্য যেন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে না যায়, সেটিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রয়েছে।
আমদানি ব্যয়ে স্বস্তির সম্ভাবনা
টাকার মূল্য শক্তিশালী হলে আমদানিকারকদের জন্য ডলারে মূল্য পরিশোধের বিপরীতে তুলনামূলক কম টাকা প্রয়োজন হয়। এতে জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতিসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়।
এনআরবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেছেন, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ বৃদ্ধির সঙ্গে টাকার শক্তিশালী হওয়া দেশের বৈদেশিক খাতে স্থিতিশীলতা বাড়াতে সহায়তা করবে। তাঁর মতে, ডলারের সরবরাহ বাড়লে আমদানি বিল পরিশোধ এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা সহজ হয়।
তবে এর প্রভাব সরাসরি বাজারদরে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক পণ্যের দাম, আমদানি ব্যয়, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসায়ীদের আমদানি চাহিদার ওপর।
রপ্তানি ও আমদানির ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ
টাকার বর্তমান শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে রেমিট্যান্সের পাশাপাশি রপ্তানি আয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ০৬ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অন্যদিকে FY26-এ আমদানি বেড়েছে ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ।
অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে বর্তমান স্বস্তির পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যও নজরে রাখতে হবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত রাখা, রপ্তানি বাড়ানো এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা টাকার বিনিময়মূল্যের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ সময় দুর্বল থাকার পর টাকার বিনিময়মূল্যে সাম্প্রতিক পরিবর্তন দেশের বৈদেশিক খাতের পরিস্থিতিতে উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই শক্তিশালী অবস্থান কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি প্রবাহ, আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার ওপর।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















