মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, সৌদি আরবের তেল সরবরাহ অবকাঠামোয় বিঘ্ন এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেলে আমদানিনির্ভর দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলোতে এর প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, খাদ্যপণ্য ও সামগ্রিক মূল্যস্তরেও চাপ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর অর্থনীতিতে জ্বালানি আমদানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম উঁচু থাকলে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয়ে চাপ
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন খাতে। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হবে। একই সঙ্গে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির দাম বাড়লে সড়ক ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়তে পারে।
পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে এর প্রভাব সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে ছড়িয়ে পড়ে। উৎপাদক থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্য পৌঁছাতে বাড়তি ব্যয় হওয়ায় খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের দামে তার প্রতিফলন ঘটতে পারে।
বাড়বে আমদানি ব্যয়, চাপ পড়বে বৈদেশিক মুদ্রায়
তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে বৈদেশিক লেনদেনে। একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে বেশি ডলার ব্যয় করতে হলে আমদানি বিল বেড়ে যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়বে। একই সময়ে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হারেও চাপ তৈরি হলে আমদানির ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
কৃষিতেও বাড়তে পারে উৎপাদন খরচ
জ্বালানি সংকটের প্রভাব কৃষি খাতেও পৌঁছাতে পারে। ডিজেলের দাম বাড়লে সেচ, কৃষিযন্ত্র পরিচালনা এবং কৃষিপণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ে। পাশাপাশি জ্বালানি ও কাঁচামালের আন্তর্জাতিক দামের পরিবর্তন রাসায়নিক সারসহ কৃষি উপকরণের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে তার একটি অংশ পণ্যের বাজারদামে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে চাল, ডাল, শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সবচেয়ে বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রভাব হতে পারে মূল্যস্ফীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সেটি সরাসরি আমদানি ব্যয় বাড়ায়। এরপর পরিবহন, বিদ্যুৎ, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সেই চাপ অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। অর্থনীতির ভাষায় একে আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতির চাপ বলা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার যেসব অর্থনীতি ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাচ্ছে, তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ জ্বালানি মূল্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পড়তে পারে।
নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন সমীকরণ
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে একাধিক নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। জ্বালানি আমদানির ব্যয়, ভর্তুকির চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং মূল্যস্ফীতি—সবকিছুকে একই সঙ্গে সামাল দিতে হবে।
একদিকে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অন্যদিকে ভোক্তা ও উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত মূল্যচাপ নিয়ন্ত্রণ করা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, বিকল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা যদি সাময়িক থাকে, তাহলে এর প্রভাব নীতিগতভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে উচ্চ মূল্য দীর্ঘস্থায়ী হলে তা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয় থেকে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—দুই দিক থেকেই বড় পরীক্ষা তৈরি করবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















