বাজারের ব্যাগে একের পর এক পণ্য ঢুকছে, অথচ টাকার হিসাব মিলছে না। তেল, আটা-ময়দা, মসলা, সবজি থেকে শুরু করে মাছ-মাংস ও দুধ—প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনেই বাড়ছে খরচ। কোনো কোনো পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও সেই স্বস্তি টের পাওয়ার আগেই অন্য পণ্যের বাড়তি দাম বাজেট এলোমেলো করে দিচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর কাছে মাসের বাজার এখন শুধু কেনাকাটা নয়, প্রতিদিনের হিসাব মেলানোর লড়াই।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদর বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কাঁচা মরিচের দাম আবার দেড়শ টাকার ঘরে, বেড়েছে ময়দা, তেল, রসুন ও তেজপাতার দামও। মাছ-মাংস, ডিম ও দুধের খরচ যোগ হয়ে বাড়ছে মাসিক বাজারের চাপ।
ফলে বাজারের তালিকা আগের মতো থাকলেও ব্যাগে ঢুকছে কম পণ্য। প্রয়োজনের সঙ্গে সামর্থ্যের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে কাটছাঁট করতে হচ্ছে খাবারের তালিকাও।
তবে সব পণ্যের দাম অবশ্য একসঙ্গে বাড়েনি। কিছু পণ্যে এক বছর আগের তুলনায় দাম কমেছে, আবার চাল-ডালের বাজারও রয়েছে তুলনামূলক স্থিতিশীল। কিন্তু তেল, আটা-ময়দা, মসলা, কয়েক ধরনের সবজি, দুধসহ বেশ কিছু পণ্যের বাড়তি দাম সামগ্রিক বাজার খরচে চাপ তৈরি করছে।
তেল-ময়দায় বাড়তি খরচ
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ টাকা এবং প্যাকেট আটা ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে। খোলা ময়দা ৭০ টাকা এবং প্যাকেট ময়দা ৮০ থেকে ৯০ টাকা। এক মাস আগে প্যাকেট ময়দার দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা।
ভোজ্য তেলের বাজারেও স্বস্তি নেই। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৪ টাকা, দুই লিটার ৪১০ টাকা এবং পাঁচ লিটার ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এক বছর আগে এসব তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১৮৮-১৯০, ৩৭৫-৩৭৮ ও ৮৯০-৯২০ টাকা।
অর্থাৎ, শুধু রান্নাঘরের নিয়মিত ব্যবহারের এই পণ্যটিতেই আগের তুলনায় বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
মসলার বাজারেও চাপ
রসুন ও তেজপাতার দামও বাড়তি। আমদানি করা রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং দেশি রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি। তেজপাতার দাম উঠেছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে। এক বছর আগে এটি বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২২৫ টাকায়।
সবজির বাজারেও ক্রেতার স্বস্তি সীমিত। কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, বেগুন ৯০ থেকে ১২০ টাকা এবং শসা ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে কাঁচা মরিচের বর্তমান দাম গত বছরের তুলনায় কম। এক বছর আগে এর দাম ছিল ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি। অর্থাৎ কিছু পণ্যে দাম কমলেও সেই স্বস্তি অন্য পণ্যের বাড়তি খরচের মধ্যে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
চাল-ডালে কিছুটা স্বস্তি
চাল ও ডালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল। সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মসুর ডালের দাম দানা অনুযায়ী ৯৫ থেকে ১৬০ টাকা কেজি।
তবে পরিবারের বাজার শুধু চাল-ডালে আটকে নেই। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও রান্নার অন্যান্য উপকরণের খরচ যোগ হলেই মাসিক বাজারের বাজেট বড় হয়ে যাচ্ছে।
মাছ-মাংসে হিসাব কঠিন
বাজারে রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেশি দামে। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি।
ফার্মের ডিমের দামও ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা হালি।
কারওয়ান বাজারের মামা-ভাগিনা কিচেন মার্কেটের বিক্রেতা রবিন মিয়া বলেন, পাইকারি বাজারে যে দামে পণ্য কিনছেন, তার সঙ্গে সামান্য লাভ যোগ করেই বিক্রি করছেন তারা। তাঁর দাবি, খুচরা বিক্রেতারা ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছেন না।
কমছে বাজারের তালিকা
সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আনতে হচ্ছে বাজারের তালিকায়। আগে যে পরিবার সপ্তাহে কয়েকবার মাছ বা মাংস কিনত, তাদের কেউ কেউ এখন পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে। সবজির ক্ষেত্রেও কম দামি পণ্য বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
চিনি ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, আয়োডিনযুক্ত লবণ ৪০ থেকে ৪২ টাকা এবং গুঁড়া দুধ ৮৩০ থেকে ৯৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যও পরিবারের নিয়মিত ব্যয়ের অংশ।
ফলে বাজারে কোনো একটি পণ্যের দাম কমলেই স্বস্তি ফিরছে না। কয়েকটি পণ্যের বাড়তি দাম মিলে তৈরি করছে সামগ্রিক চাপ। নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলোর কাছে তাই এখন বাজারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কী কিনবেন, আর কী বাদ দেবেন।
বাজারের ব্যাগ ভরার আগেই পকেট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার এই হিসাবই যেন এখন শহুরে সংসারের নতুন বাস্তবতা।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















