০৭:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানে নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণ: যুদ্ধের প্রস্তুতি, নাকি নিয়ন্ত্রণ জোরদারের কৌশল?

The gallery was not found!

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরানে আবারও বড় পরিসরে সাধারণ নাগরিকদের সামরিক ও জরুরি সেবার প্রশিক্ষণে যুক্ত করা হচ্ছে। ‘জানফাদা’ কর্মসূচির আওতায় নারী, পুরুষ ও কিশোরদের অংশগ্রহণে তেহরানে সামরিক মহড়াও হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য এরই মধ্যে ৬ লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। আগামী পর্যায়ে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়াতে পারে।

১৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় মহড়ায় হাজারো মানুষ সামরিক পোশাকে অংশ নেন। কারও হাতে ছিল অস্ত্র, কোথাও প্রদর্শন করা হয় ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, মহড়ায় ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষ অংশ নেওয়ার কথা ছিল। শিয়া ইসলামী ঐতিহ্যে ৩১৩ সংখ্যাটির বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অধীন বাসিজ মিলিশিয়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে জানফাদা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ‘জানফাদা’ শব্দের অর্থ ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত মানুষ। কর্মসূচির আওতায় শুধু অস্ত্র প্রশিক্ষণ নয়, উদ্ধারকাজ, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম এবং আর্থিক সহায়তার মতো কাজেও স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে নিবন্ধনের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা এক পর্যায়ে ৩ কোটি ১০ লাখ এবং পরে ৩ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধনের দাবি করেন। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে বিস্তারিত সরকারি নথি প্রকাশ করা হয়নি। বিদেশভিত্তিক কয়েকজন কর্মী কর্মসূচির ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে এর চেয়ে অনেক কম নিবন্ধনের দাবি করেছিলেন। আবার নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন না থাকায় শুধু ফোন নম্বর ব্যবহার করেও নাম লেখানো সম্ভব হয়েছে। ফলে নিবন্ধিত ব্যক্তির সংখ্যা এবং বাস্তবে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা এক নয়।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনকারীদের মাত্র ২৬ শতাংশ সামরিক বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত কাজ বেছে নিয়েছেন। বাকিরা উদ্ধার, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম ও অর্থনৈতিক সহায়তার মতো কাজে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এতে স্পষ্ট হয়, জানফাদা শুধু সামরিক বাহিনী সম্প্রসারণের কর্মসূচি নয়; বরং সংকট মোকাবিলায় একটি বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ার উদ্যোগও।

কেন এত বড় প্রস্তুতি

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধ এখনো পুরোপুরি মেটেনি। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর নতুন হামলার আশঙ্কা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা তেহরানকে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাড়াতে উৎসাহিত করছে। ইরানি কর্মকর্তারাও সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলছেন। সেই বিবেচনায় জানফাদা কর্মসূচিকে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা স্তর তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দিক নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং সামাজিক অস্থিরতার সময় রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অতীতে বাসিজকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জানফাদা একদিকে বহিরাগত হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার উপায়।

কিশোরদের অংশগ্রহণে উদ্বেগ

কর্মসূচিতে কিশোরদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের বেশি বয়সি ছেলেরা নিবন্ধন করতে পারছে। বিভিন্ন মহড়ায় কিশোরদের হাতে অ্যাসল্ট রাইফেল দেখা গেছে। তবে এসব অস্ত্র কার্যকর ছিল কি না এবং কিশোররা আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ পেয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

নারীদের অংশগ্রহণও কর্মসূচির প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। সামরিক পোশাকে অস্ত্র হাতে নারীদের মিছিল এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। সরকার এটিকে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।

সব মিলিয়ে, জানফাদা কর্মসূচি ইরানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। এটি আসন্ন স্থলযুদ্ধের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। তবে যুদ্ধের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক সংকট, জরুরি সেবা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—সবকিছুকে এক কাঠামোর মধ্যে এনে সাধারণ নাগরিকদের সংগঠিত করার যে উদ্যোগ ইরান নিয়েছে, তা দেশটির নিরাপত্তা নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের মিলনমেলা, আলোচনায় যুদ্ধ-জলবায়ু ও নিরাপত্তা

Business Times24

ইরানে নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণ: যুদ্ধের প্রস্তুতি, নাকি নিয়ন্ত্রণ জোরদারের কৌশল?

Update Time : ০৪:৫৫:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইরানে আবারও বড় পরিসরে সাধারণ নাগরিকদের সামরিক ও জরুরি সেবার প্রশিক্ষণে যুক্ত করা হচ্ছে। ‘জানফাদা’ কর্মসূচির আওতায় নারী, পুরুষ ও কিশোরদের অংশগ্রহণে তেহরানে সামরিক মহড়াও হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য এরই মধ্যে ৬ লাখের বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। আগামী পর্যায়ে এই সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়াতে পারে।

১৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় মহড়ায় হাজারো মানুষ সামরিক পোশাকে অংশ নেন। কারও হাতে ছিল অস্ত্র, কোথাও প্রদর্শন করা হয় ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, মহড়ায় ৩ লাখ ১৩ হাজার মানুষ অংশ নেওয়ার কথা ছিল। শিয়া ইসলামী ঐতিহ্যে ৩১৩ সংখ্যাটির বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অধীন বাসিজ মিলিশিয়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে জানফাদা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। ‘জানফাদা’ শব্দের অর্থ ইরানের জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত মানুষ। কর্মসূচির আওতায় শুধু অস্ত্র প্রশিক্ষণ নয়, উদ্ধারকাজ, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম এবং আর্থিক সহায়তার মতো কাজেও স্বেচ্ছাসেবীদের যুক্ত করা হচ্ছে।

তবে নিবন্ধনের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা এক পর্যায়ে ৩ কোটি ১০ লাখ এবং পরে ৩ কোটি ৩০ লাখ নিবন্ধনের দাবি করেন। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে বিস্তারিত সরকারি নথি প্রকাশ করা হয়নি। বিদেশভিত্তিক কয়েকজন কর্মী কর্মসূচির ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে এর চেয়ে অনেক কম নিবন্ধনের দাবি করেছিলেন। আবার নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন না থাকায় শুধু ফোন নম্বর ব্যবহার করেও নাম লেখানো সম্ভব হয়েছে। ফলে নিবন্ধিত ব্যক্তির সংখ্যা এবং বাস্তবে প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা এক নয়।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনকারীদের মাত্র ২৬ শতাংশ সামরিক বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত কাজ বেছে নিয়েছেন। বাকিরা উদ্ধার, সামাজিক সেবা, গণমাধ্যম ও অর্থনৈতিক সহায়তার মতো কাজে আগ্রহ দেখিয়েছেন। এতে স্পষ্ট হয়, জানফাদা শুধু সামরিক বাহিনী সম্প্রসারণের কর্মসূচি নয়; বরং সংকট মোকাবিলায় একটি বৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক গড়ার উদ্যোগও।

কেন এত বড় প্রস্তুতি

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরোধ এখনো পুরোপুরি মেটেনি। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর নতুন হামলার আশঙ্কা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা তেহরানকে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাড়াতে উৎসাহিত করছে। ইরানি কর্মকর্তারাও সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলছেন। সেই বিবেচনায় জানফাদা কর্মসূচিকে সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা স্তর তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দিক নিয়েও আলোচনা রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং সামাজিক অস্থিরতার সময় রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অতীতে বাসিজকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জানফাদা একদিকে বহিরাগত হুমকি মোকাবিলার প্রস্তুতি, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার উপায়।

কিশোরদের অংশগ্রহণে উদ্বেগ

কর্মসূচিতে কিশোরদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের বেশি বয়সি ছেলেরা নিবন্ধন করতে পারছে। বিভিন্ন মহড়ায় কিশোরদের হাতে অ্যাসল্ট রাইফেল দেখা গেছে। তবে এসব অস্ত্র কার্যকর ছিল কি না এবং কিশোররা আনুষ্ঠানিক সামরিক প্রশিক্ষণ পেয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

নারীদের অংশগ্রহণও কর্মসূচির প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। সামরিক পোশাকে অস্ত্র হাতে নারীদের মিছিল এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। সরকার এটিকে জাতীয় ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।

সব মিলিয়ে, জানফাদা কর্মসূচি ইরানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। এটি আসন্ন স্থলযুদ্ধের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। তবে যুদ্ধের আশঙ্কা, অর্থনৈতিক সংকট, জরুরি সেবা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—সবকিছুকে এক কাঠামোর মধ্যে এনে সাধারণ নাগরিকদের সংগঠিত করার যে উদ্যোগ ইরান নিয়েছে, তা দেশটির নিরাপত্তা নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।