চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার মধ্যে এবার কয়েক ডজন দেশকে কার্যত পক্ষ বেছে নিতে বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের বার্তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এআই উদ্যোগে থাকতে হলে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো উদ্যোগে একই সঙ্গে যোগ দেওয়া যাবে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দেখা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ খসড়া চিঠি ও এক মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যে এ তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুনে ‘এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্টে’ স্বাক্ষর করা ৩৫টি দেশকে এই বার্তা দেওয়া হবে। এই ৩৫ দেশের মধ্যে রয়েছে প্যাক্স সিলিকা (প্যাক্স সিলিকা) নামের মার্কিন নেতৃত্বাধীন উদ্যোগের সদস্যরা। এ ছাড়া এমন দেশও রয়েছে, যারা এআই নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
কেন এতটা চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্র গত বছর প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগ চালু করে। এর লক্ষ্য হলো এআই মডেল, সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ করা। বর্তমানে প্রায় দুই ডজন দেশ এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও কাজাখস্তান। কিন্তু কাজাখস্তান একই সঙ্গে চীনের নতুন এআই উদ্যোগেও যোগ দিয়েছে। ফলে দেশটি এখন ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের দুই ব্যবস্থারই অংশ। এটিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খসড়া চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সবকিছুর অংশ হতে গেলে শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুরই অংশ থাকা হয় না।’ এতে আরও বলা হয়েছে, প্যাক্স সিলিকা ডিক্লারেশনে স্বাক্ষর করা শুধু সদস্যপদ নেওয়া নয়, বরং এটি একটি অঙ্গীকার। দেশগুলোকে তাই এআই সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত’ নিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে সরাসরি চীনের নাম না থাকলেও বলা হয়েছে, প্যাক্স সিলিকার সঙ্গে এমন প্রতিদ্বন্দ্বী উদ্যোগের সদস্যপদ রাখা সম্ভব নয়, যেগুলোর প্রত্যাশা যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার—‘দুই দিক একসঙ্গে বেছে নেওয়া যাবে না।’ তাঁর মতে, কোনো দেশ একই সঙ্গে একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থার বিশ্বস্ত অংশীদার হওয়ার দাবি করতে পারে না এবং এমন একটি চীনা উদ্যোগেও যোগ দিতে পারে না, যার লক্ষ্য এআই নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলা।
চীনের পাল্টা উদ্যোগ
জুলাইয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন চালু করেন। চীন এটিকে এআই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামো হিসেবে তুলে ধরছে। এর মাধ্যমে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিপরীতে নিজের প্রযুক্তিগত ও নীতিগত প্রভাব বাড়াতে চাইছে। জুলাইয়ে ২৯টি দেশ এই সংস্থা প্রতিষ্ঠার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
চীন বিশেষ করে তার ওপেন-ওয়েইট (open-weight) এআই মডেলগুলো সামনে আনছে। এসব মডেলের প্রযুক্তিগত কাঠামো তুলনামূলকভাবে বেশি উন্মুক্ত হওয়ায় এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো কোম্পানির মালিকানাধীন এআই সিস্টেমের বিকল্প হিসেবে দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। এই প্রতিযোগিতা এখন শুধু প্রযুক্তি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সবচেয়ে উন্নত এআই সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের লড়াই ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে পরিণত হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 


























