দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’ অনুযায়ী নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন গ্রেডভেদে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য এটি বড় ধরনের বেতন সমন্বয় হলেও এর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে বাজারে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠছে—সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লেও দেশের বৃহৎ অংশের মানুষের আয় যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে তাদের ক্রয়ক্ষমতায় কতটা পরিবর্তন আসবে?
ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
নতুন পে-স্কেল কার্যকর ধরা হয়েছে ১ জুলাই থেকে। তবে বর্ধিত বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন।
পরবর্তী সময়ে এই হার আরও বাড়বে এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে শতভাগ মূল বেতন কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
বাড়তি আয়, কিন্তু বাজারে স্বস্তি কতটা?
নতুন বেতনকাঠামোর সময় দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ এখনো রয়েছে। সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ার ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে সেই বাড়তি আয়ের একটি অংশ আবার বাজারেই চলে যেতে পারে।
চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা—জীবনযাত্রার বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের মাসিক বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন অনেক ভোক্তা।
ফলে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পর বাজারে পণ্যের দাম ও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তন এখন বিশেষ নজরে থাকবে।
আয়বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবী মানুষের আয় নিয়েও ভাবতে হবে।
দেশের বেসরকারি চাকরিজীবী, পোশাকশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় যদি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে না বাড়ে, তাহলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের আয়ের ব্যবধান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের উদ্ধৃত বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের আয় সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে অর্থায়ন করা হবে, সেটিও অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজারে নজরদারি জরুরি
নতুন পে-স্কেলের কারণে একটি বড় অংশের মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আসবে। এতে বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়তে পারে। চাহিদা বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তুলে ধরেছেন অর্থনীতিবিদরা।
তাই পে-স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজারে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট ঠেকানো এবং নিত্যপণ্যের বাজারে কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শ্রমিকদেরও নতুন দাবি
সরকারি কর্মীদের নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার পর বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মধ্যেও মজুরি সমন্বয়ের দাবি জোরালো হয়েছে।
বিশেষ করে পোশাকশ্রমিক সংগঠনগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।
বর্তমানে পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় এই মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সরকারের অবস্থান
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে একসঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কমবে বলে মনে করছে সরকার।
নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের বেতন সমন্বয়ের দাবিও পূরণ হচ্ছে।
সামনে বড় পরীক্ষা বাজার নিয়ন্ত্রণ
নবম পে-স্কেলের মাধ্যমে সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ছে—এটি এখন বাস্তবতা। কিন্তু এই বাড়তি আয় বাজারে গিয়ে কতটা প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতায় রূপ নেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে, দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয় একই হারে না বাড়লে নতুন বেতনকাঠামোর সুফল কতটা বিস্তৃত হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পে-স্কেলের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপণ্যের বাজারে নজরদারি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের মজুরি সমন্বয়—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কারণ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—বেতন বাড়ার পর বাজারে গিয়ে আগের চেয়ে বেশি পণ্য কেনার সক্ষমতা তৈরি হবে, নাকি বাড়তি আয়ের বড় অংশই চলে যাবে বাড়তি খরচ মেটাতে?

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















