০৭:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হরমুজ দখলের হুমকি, কী বার্তা দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট?

The gallery was not found!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নিউইয়র্কে এক বক্তব্যে তিনি হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক আইন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর আলোকে এই ঘোষণা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।

আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা

মার্কিন সংবিধানের সীমাবদ্ধতা: সাবেক মার্কিন অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইনের মতে, একতরফা ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট কোনো ভূখণ্ড যুক্ত করতে পারেন না। এর জন্য প্রয়োজন কংগ্রেসের আইন অথবা সিনেটের চুক্তি (যেমনটা লুইজিয়ানা বা পানামা খালের ক্ষেত্রে হয়েছিল)।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন : হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক প্রণালি। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক জলপথ একতরফাভাবে নিজের দাবি করা বেআইনি এবং তা ‘আগ্রাসী যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভৌগোলিক সীমার বৈষম্য

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশটির প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী উপকূলীয় দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নিজস্ব জলসীমা থাকে। ফলে এই প্রণালিতে মূলত ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা বিদ্যমান। ভৌগোলিকভাবে এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূখণ্ডীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই।

ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য: মনস্তাত্ত্বিক চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত দর-কষাকষির কৌশল। জুনে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষয়ী সমঝোতার মেয়াদ পার হওয়ায় দুই দেশই কঠোর অবস্থানে।

শোম্যানশিপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, এটি মার্কিন ভোটারদের উদ্দেশ্যে এবং ইরানকে মানসিকভাবে চাপে রাখতে দেওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৫% মার্কিন নাগরিক এই সংঘাত সমর্থন করছেন।

জ্বালানি সংকট: যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি পেট্রলের দাম ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, প্রশাসনের এখন মূল লক্ষ্য তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা।

অস্ত্রের ঘাটতি: পেন্টাগন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রসহ মূল যুদ্ধসামগ্রীর মজুত নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে পরিণত হওয়া বাস্তবে অসম্ভব। আন্তর্জাতিক আইন বা সামরিক শক্তি—কোনো দিক দিয়েই এই দাবির ভিত্তি নেই। তবে এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট যে, তেলের প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই ‘দাবার খেলায়’ মার্কিন প্রশাসন এখনই অবস্থান নরম করছে না। শেষ পর্যন্ত ইরান না যুক্তরাষ্ট্র—কে কূটনৈতিক টেবিলে প্রথম পিছু হটে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের মিলনমেলা, আলোচনায় যুদ্ধ-জলবায়ু ও নিরাপত্তা

Business Times24

হরমুজ দখলের হুমকি, কী বার্তা দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট?

Update Time : ১২:৪৬:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। নিউইয়র্কে এক বক্তব্যে তিনি হরমুজ প্রণালিকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ হিসেবে ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক আইন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর আলোকে এই ঘোষণা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।

আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা

মার্কিন সংবিধানের সীমাবদ্ধতা: সাবেক মার্কিন অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইনের মতে, একতরফা ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট কোনো ভূখণ্ড যুক্ত করতে পারেন না। এর জন্য প্রয়োজন কংগ্রেসের আইন অথবা সিনেটের চুক্তি (যেমনটা লুইজিয়ানা বা পানামা খালের ক্ষেত্রে হয়েছিল)।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন : হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক প্রণালি। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক জলপথ একতরফাভাবে নিজের দাবি করা বেআইনি এবং তা ‘আগ্রাসী যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভৌগোলিক সীমার বৈষম্য

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশটির প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী উপকূলীয় দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নিজস্ব জলসীমা থাকে। ফলে এই প্রণালিতে মূলত ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক জলসীমা বিদ্যমান। ভৌগোলিকভাবে এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূখণ্ডীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই।

ট্রাম্পের আসল লক্ষ্য: মনস্তাত্ত্বিক চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত দর-কষাকষির কৌশল। জুনে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষয়ী সমঝোতার মেয়াদ পার হওয়ায় দুই দেশই কঠোর অবস্থানে।

শোম্যানশিপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, এটি মার্কিন ভোটারদের উদ্দেশ্যে এবং ইরানকে মানসিকভাবে চাপে রাখতে দেওয়া একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৫% মার্কিন নাগরিক এই সংঘাত সমর্থন করছেন।

জ্বালানি সংকট: যুক্তরাষ্ট্রে গ্যালনপ্রতি পেট্রলের দাম ৪ ডলার ছাড়িয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্বীকার করেছেন, প্রশাসনের এখন মূল লক্ষ্য তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা।

অস্ত্রের ঘাটতি: পেন্টাগন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রসহ মূল যুদ্ধসামগ্রীর মজুত নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে পরিণত হওয়া বাস্তবে অসম্ভব। আন্তর্জাতিক আইন বা সামরিক শক্তি—কোনো দিক দিয়েই এই দাবির ভিত্তি নেই। তবে এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট যে, তেলের প্রবাহ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই ‘দাবার খেলায়’ মার্কিন প্রশাসন এখনই অবস্থান নরম করছে না। শেষ পর্যন্ত ইরান না যুক্তরাষ্ট্র—কে কূটনৈতিক টেবিলে প্রথম পিছু হটে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।