বিশ্ববাজারে আবারও শান্তির প্রত্যাশা, তবু কাটেনি যুদ্ধের শঙ্কা। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনায় বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে।
তবে ইয়েমেনের হুতিদের হামলা জোরদার হওয়ার আশঙ্কা এবং ইরানকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ফলে দাম কমলেও বাজারে স্বস্তি ফিরেছে, এমনটা বলার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাইকে চিঠি পাঠিয়েছেন ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও আলোচনাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। আলোচনার সম্ভাবনাই তেলের বাজারে দাম কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা ৩২ মিনিটে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে ১১৪ ডলার ৫০ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১ ডলার ৪ সেন্ট বা ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার ৭৪ সেন্ট হয়।
নোমুরা সিকিউরিটিজের অর্থনীতিবিদ ইউকি তাকাশিমার মতে, শান্তি আলোচনা শুরুর প্রত্যাশায় বাজারে তেল বিক্রির চাপ বেড়েছে। তবে দাম কমার পরিমাণ এখনো সীমিত। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
হামলার আশঙ্কায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
শান্তির উদ্যোগের পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনাও তেলের বাজারকে চাপে রাখছে। বৃহস্পতিবার ভোরে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট জানায়, ইয়েমেনের হুতিরা দেশটির পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। জোটের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করা হয়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার হুতিরা এডেন বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর আগের দিন তারা দাবি করে, ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সৌদি আরবের বৃহত্তম তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে। দৈনিক ৫ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন স্থাপনাটিতে হামলার খবর সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা বাজারে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলা হতে পারে—এমন আশঙ্কাও তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
চুক্তির খসড়া নিয়ে মতভেদ
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে নতুন একটি খসড়া চুক্তি তেহরানের কাছে উপস্থাপন করেছেন কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা। আলোচনার বিষয়ে অবহিত এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, এতে এমন কিছু ধারণা তুলে ধরা হয়েছে, যা আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পর্যায়েও পড়ে না। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে তেহরান এখনো সুযোগ দিচ্ছে। ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত কমেছে
তেলের বাজারে প্রভাব ফেলছে যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের হিসাবও। দেশটির জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) জানিয়েছে, ২৩ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে জ্বালানি কোম্পানিগুলো মজুত থেকে ১৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরিয়ে নিয়েছে। অথচ রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা ওই সময়ে মজুত ১৫ হাজার ব্যারেল বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
তবে একই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের মজুত ৩৯ লাখ ব্যারেল বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা যেখানে পেট্রলের মজুত ৯ লাখ ব্যারেল কমার প্রত্যাশা করেছিলেন, সেখানে উল্টো বৃদ্ধি বাজারের চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সব মিলিয়ে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তেলের দামে সাময়িক স্বস্তি আনলেও সংঘাতের বিস্তার, জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাজারকে এখনো অস্থির করে রেখেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা এগোয়, তার ওপরই আগামী দিনে তেলের দামের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















