ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বাড়াতে ব্যাংকের কাছে ঋণ চাইছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পাচ্ছেন না তাঁরা। ২০ লাখ টাকা ঋণের আবেদন করেও মিলছে মাত্র ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। কোথাও বাড়তি ঋণসীমা অনুমোদন হচ্ছে না, আবার কোথাও মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও ঋণ মিলছে না। এতে একদিকে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
উদ্যোক্তাদের এমন পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে। টানা ছয় মাস ধরে এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম নিম্ন পর্যায়। ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার অনীহা, বিনিয়োগে ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বেসরকারি খাতে অর্থের প্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
স্যুভেনির প্রস্তুতকারক এসএমই প্রতিষ্ঠান হাতবাক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাফাত কাদির একটি বেসরকারি ব্যাংকে ২০ লাখ টাকার চলতি মূলধন ঋণের আবেদন করে পেয়েছেন মাত্র ৪–৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব। তাঁর ভাষ্য, ব্যবসার নিয়মিত লেনদেন ও আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলেও ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম অর্থ দিতে চাইছে। অন্য একটি ব্যাংকে সাপ্লাই চেইন ঋণের আবেদন করেও তিন মাসে সাড়া পাননি তিনি। তাঁর মতে, প্রয়োজনের সময় অর্থ না পেলে ব্যবসা সম্প্রসারণ সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামের হিফস অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজও ২০ কোটি টাকার ঋণ চেয়ে মাত্র ৩–৪ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান জানান, পণ্য রপ্তানিতে আগে যেখানে ৪৫ দিন লাগত, এখন সেখানে তিন মাস সময় লাগছে। ফলে ব্যবসা পরিচালনায় অতিরিক্ত মূলধন প্রয়োজন হলেও ব্যাংক থেকে প্রত্যাশিত সহায়তা মিলছে না।
নিট পোশাকশিল্পের অবস্থাও একই রকম। বিকেএমইএর সদস্য ৭৮টি বন্ধ এবং ১০৯টি আংশিক বন্ধ কারখানা চালুর জন্য সরকারের প্রণোদনা তহবিল থেকে ঋণ চেয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের দাবি, এখন পর্যন্ত নিট পোশাক খাতের কোনো প্রতিষ্ঠান ওই তহবিল থেকে ঋণ পায়নি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রস্তাব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পেরিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গেলেও বন্ধ কারখানা চালুর ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই।
ইস্পাত খাতেও অর্থসংকট প্রকট। আরআরএম গ্রুপের দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ৬০০ কোটি টাকার ঋণসীমা অনুমোদিত থাকলেও ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আরও ২০০ কোটি টাকা চেয়ে অনুমোদন পায়নি গ্রুপটি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সুমন চৌধুরীর মতে, ইস্পাত খাতের ৪৮টি বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০–৩২টি বাড়তি ঋণসীমা চেয়েও পায়নি। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান অর্ধেক সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে।
প্রণোদনা থাকলেও বিতরণে ধীরগতি
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে গত মে মাসে ৬২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। পুরো প্যাকেজ থেকে ছাড় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। মে মাসে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হলেও পরবর্তী সময়ে আবার কমে যায়। আগস্টে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর আগে ২০১০–১১ অর্থবছরে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে তা ছিল ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ, পরের অর্থবছরে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
সুদ কমলেও কাটছে না অনিশ্চয়তা
ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২১ মাস পর গত আগস্টে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করে। এতে ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যয় কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শুধু সুদ কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, করনীতি এবং প্রশাসনিক জটিলতাও বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, অনেক ব্যাংক নিজেরাই সমস্যায় থাকায় ঋণ কার্যক্রম সীমিত করেছে। পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগের চাহিদাও কম। তবে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বিতরণ বাড়লে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কাসেম খান মনে করেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকারের উদ্যোগগুলো ইতিবাচক হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৌরবিদ্যুতের মতো বিকল্প জ্বালানিতে প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে ব্যাংকঋণের বাস্তব চিত্রের বড় ব্যবধান রয়েছে। উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে উৎপাদন সম্প্রসারণ, নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। তাই শুধু ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা নয়, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে সময়মতো অর্থ পৌঁছানোই এখন অর্থনীতির গতি ফেরানোর বড় চ্যালেঞ্জ।

নিজস্ব প্রতিবেদক 




















