চোর ভেবেছিল, ছবির চেহারা বদলে দিলেই আর কেউ চিনতে পারবে না। তাই সাদা মেষশাবককে বানানো হলো পাণ্ডুলিপি, মাথার জ্যোতির্বলয় উধাও, পামগাছের ডালও গায়েব। দেখতে সেই একই তরুণী, কিন্তু তার পরিচয় আর আগের মতো নেই। পরিকল্পনা মন্দ ছিল না! তবে একটা সমস্যা ছিল—চোরের হিসাবের মধ্যে ছিল না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। শেষ পর্যন্ত মানুষের চোখকে ফাঁকি দেওয়া সেই চিত্রকর্মই ধরা পড়ল যন্ত্রের চোখে।
ঘটনাটি ইতালির। প্রায় ২০ বছর আগে চুরি হওয়া ১৭শ শতকের একটি চিত্রকর্ম উদ্ধার করতে পুলিশকে সাহায্য করেছে এআই প্রযুক্তি। আর এ কাহিনিতে চোরের সাজানো ছদ্মবেশের চেয়ে বেশি চমকপ্রদ হয়ে উঠেছে ছবির পুরোনো পরিচয় খুঁজে বের করার প্রযুক্তির ক্ষমতা।
পুরাকীর্তির মেলায় অদ্ভুত এক ছবি
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইতালির পারমা শহরে বার্ষিক পুরাকীর্তি মেলায় ঘুরছিলেন পুলিশের সদস্যরা। তাদের হাতে ক্যামেরা। সামনে পুরোনো তৈলচিত্র, ব্রোঞ্জের মূর্তি, পাত্র আর নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন। দেখে মনে হতে পারে, কর্মকর্তারা বুঝি শিল্পকর্মের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। আসলে চলছিল গোয়েন্দা অভিযান।
মেলার বিভিন্ন স্টল থেকে তোলা ছবি আপলোড করা হচ্ছিল পুলিশের ডেটাবেজে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি ছবিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করল এআই ব্যবস্থা। ছবিতে এক তরুণীর হাতে আংশিক খোলা পাণ্ডুলিপি। পুলিশের সন্দেহ হলো, ছবির কোথাও যেন একটা গরমিল আছে।
পরদিনই চিত্রকর্মটি জব্দ করা হলো। শুরু হলো বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
মেষশাবক যখন পাণ্ডুলিপি!
ছবিটির আসল রহস্য লুকিয়ে ছিল ছোট ছোট কিছু পরিবর্তনে। মূল চিত্রকর্মে তরুণীটির হাতে ছিল সাদা মেষশাবক ও পামগাছের ডাল। মাথার ওপর ছিল জ্যোতির্বলয়। এগুলো সেন্ট অ্যাগনেসের ধর্মীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন।
কিন্তু চুরির পর ছবিটিকে নতুন রূপ দেওয়া হয়। মেষশাবককে পাণ্ডুলিপির মতো দেখানো হয়, মুছে ফেলা হয় জ্যোতির্বলয় ও পামগাছের ডাল। অর্থাৎ, ছবির পরিচয় আড়াল করতে রীতিমতো সাজসজ্জার কাজ চলেছিল!
কিন্তু এআই শুধু ছবির দৃশ্যমান বিষয়বস্তু দেখে না। রং, আকৃতি ও সামগ্রিক বিন্যাসের মধ্যেও মিল খুঁজতে পারে। তাই নতুন সাজেও পুরোনো ছবির ছাপ মুছে ফেলা যায়নি।
২০ বছরের রহস্যের অবসান
তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, প্রায় এক মিটার উঁচু চিত্রকর্মটি ২০০৪ সালের ১১ আগস্ট রাতে ইতালির সুলমোনার ভারগো পোটেনস গির্জা থেকে চুরি হয়েছিল। দুই দশক পর সেটি উদ্ধার করে ২০২৫ সালের ২০ মে আবার সেই গির্জায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ইতালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষাবিষয়ক পুলিশ ইউনিটের লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালভাতোরে রাপিকাভোলির দলের তৈরি এআই ব্যবস্থা ‘সোয়াডস’ চুরি হওয়া শিল্পকর্ম শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ব্যবস্থা চালুর পর এ প্রযুক্তির সহায়তায় ৩০০টির বেশি বড় চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য এবং এক লাখ ৬৫ হাজারের বেশি ছোট ঐতিহাসিক নিদর্শন উদ্ধারের কথা জানিয়েছে তাঁর দল।
সব চিত্রকর্মের মূল্য কোটি কোটি টাকা নয়। কিছু শিল্পকর্মের দাম মাপা যায় না অর্থের অঙ্কে; মাপতে হয় মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যে। সেন্ট অ্যাগনেসের ছবিটিও তেমন।
চোর ছবির রং বদলেছিল, পরিচয় আড়াল করেছিল। কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি মুছে দিতে পারেনি। আর এআই যেন মনে করিয়ে দিল—ছদ্মবেশ যত নিখুঁতই হোক, পুরোনো পরিচয়ের কোথাও না কোথাও ছাপ থেকেই যায়!

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















