একসময় ট্রফি আর ক্রেস্ট তৈরির ব্যবসা করতেন। করোনা মহামারি সেই ব্যবসায় এমন ধাক্কা দিল যে আয় বন্ধ, ঋণের বোঝা বাড়তে থাকল, অংশীদারেরাও একে একে সরে গেলেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু খালেদা বেগম লুনা বেছে নিলেন ভিন্ন পথ।
পুরোনো ব্যবসার ধরন বদলে শুরু করলেন কোটপিন তৈরির কাজ। সেই ছোট উদ্যোগই এখন বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ব্যবসা। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ২৫ জন মানুষ।
রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ‘কোট পিন বিডি’ নামের প্রতিষ্ঠানটি এখন নানা ধরনের স্মারক ও উপহারসামগ্রী তৈরির পরিচিত নাম। লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের সাফল্যের পেছনে রয়েছে সময় বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া, গ্রাহকের চাহিদা বোঝা আর প্রতিকূলতায় হাল না ছাড়ার গল্প।
ক্রেস্ট থেকে কোটপিন
গল্পের শুরু ২০১১ সালে। খালেদার স্বামী এস এম আবদুস শাকুর চার বন্ধুকে নিয়ে রাজধানীর কাঁটাবনে ক্রেস্ট, ট্রফি, মগ ও চাবির রিং তৈরির ব্যবসা শুরু করেন। একসময় খালেদাও যুক্ত হন সেই কাজে। ব্যবসা ভালোই চলছিল। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নানা আয়োজন বন্ধ হয়ে গেলে স্মারকসামগ্রীর চাহিদা কমে যায়। ব্যবসায় নেমে আসে স্থবিরতা।
তবে বিপর্যয়কে শেষ বলে মানেননি খালেদা। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ভাবতে থাকেন, নতুন কী করা যায়। খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, ধাতব মুদ্রা দিয়ে কোটপিন ও ব্যাজসহ নানা স্মারক তৈরি করা সম্ভব। বাজারে ভালো মানের এসব পণ্য তৈরির সুযোগও রয়েছে। ব্যস, শুরু হলো নতুন যাত্রা।
৫০ লাখ টাকার অর্ডারে মোড় ঘোরানো
ফেসবুকে ‘কোট পিন বিডি’ নামে একটি পেজ খুলে ছোট ছোট অর্ডার দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। এরপর আসে বড় সুযোগ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের শতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে কোটপিনসহ স্মারকসামগ্রী তৈরির ৫০ লাখ টাকার অর্ডার পান তাঁরা। এই কাজ ব্যবসাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
এরপর আর শুধু কোটপিনে আটকে থাকেনি প্রতিষ্ঠানটি। তৈরি হতে থাকে মেটাল ব্যাজ, টাইপিন, কাফলিং, নেমপ্লেট, ট্রফি, মেডেল ও ক্রেস্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক সংস্থা ও দূতাবাসের জন্যও পণ্য সরবরাহ করছে তারা।
এক পিস থেকে হাজার পিস
খালেদার ব্যবসার একটি বিশেষ দিক হলো, ক্রেতা চাইলে এক পিস পণ্যও কিনতে পারেন। আবার বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপুলসংখ্যক পণ্য তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে। নিজস্ব নকশায় পণ্য তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী চীন থেকেও পণ্য বানিয়ে আনেন তিনি। এলিফ্যান্ট রোডে রয়েছে তাঁর ছোট কারখানা।
এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছে ‘কোট পিন বিডি’। প্রতি মাসে গড়ে ২০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। দেশের বাইরেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে নিউজিল্যান্ড, হংকং ও যুক্তরাজ্যে যাচ্ছে এসব পণ্য।
সামনে বড় স্বপ্ন
ডলারের দর ও চীনা মুদ্রার মূল্যবৃদ্ধিতে কাঁচামাল ও পণ্য আমদানির খরচ বাড়ছে। তবু গ্রাহক ধরে রাখতে দাম বেশি না বাড়ানোর চেষ্টা করেন খালেদা। তাঁর বিশ্বাস, ব্যবসায় শুধু মুনাফা নয়, ক্রেতার আস্থাও বড় সম্পদ।
ভবিষ্যতে বড় পরিসরে মেটাল পণ্য তৈরির কারখানা গড়তে চান তিনি। ঢাকায় নিজস্ব ব্র্যান্ডের একাধিক বিক্রয়কেন্দ্র চালুর স্বপ্নও রয়েছে তাঁর।
করোনার সংকট থেকে উঠে এসে খালেদা বেগম দেখিয়েছেন, ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় বিপুল পুঁজি লাগে না। প্রয়োজন বাজারের সুযোগ চিনতে পারা, নতুন পথে হাঁটার সাহস আর লেগে থাকার মানসিকতা। লাখ টাকার উদ্যোগ থেকে আড়াই কোটি টাকার ব্যবসায় পৌঁছানোর গল্পটি তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্য নয়, প্রতিকূলতাকে সম্ভাবনায় বদলে দেওয়ারও গল্প।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















