০৯:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

বেনামি মালিকানায় লাগাম, বদলাচ্ছে ৩৫ বছরের কোম্পানি আইন

The gallery was not found!

কাগজে কোম্পানির শেয়ার একজনের নামে, অথচ আড়াল থেকে প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্য কেউ—এমন গোপন মালিকানার সুযোগ বন্ধ করতে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন বিধান কার্যকর হলে কোম্পানির প্রকৃত মালিক ও নিয়ন্ত্রণকারীর পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল নিবন্ধন, নথি সংরক্ষণ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ জন্য ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৪০টি ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইন প্রণয়নের প্রায় ৩৫ বছর পর বড় পরিসরে সংশোধনের এ উদ্যোগে প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বেনামি মালিকানায় অনিয়মের ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক গেটওয়ে কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কে টেল লিমিটেডের প্রায় ১২৬ কোটি টাকার টেলিযোগাযোগ বিল বকেয়া থাকার ঘটনা গোপন মালিকানার ঝুঁকি সামনে এনেছিল। কোম্পানিটির মালিকানা তিন ব্যক্তির নামে হস্তান্তর দেখানো হলেও তাঁদের একজন সাখাওয়াত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করার নির্দেশ দেন। পরবর্তী তদন্তে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ব্যাংক খাতেও গোপন মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত শেয়ার ছিল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২২ শতাংশ। এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ বিতরণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

প্রকৃত মালিকের পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক

সংশোধনী খসড়ায় নতুন ৩৪(ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে কাগজে শেয়ারধারী ব্যক্তির পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও প্রকৃত মালিক হিসেবে গণ্য করা হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, মালিকানা পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন ঘোষণা দিতে হবে। নির্ধারিত ফরমে এসব তথ্য নিবন্ধকের কাছে জমা দিতে হবে। প্রকৃত মালিকানার ঘোষণা না দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। নিয়ম অমান্য অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০০ টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

এ বিধান কার্যকর হলে অন্যের নামে শেয়ার রেখে প্রকৃত মালিকানা গোপন করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য তথ্য সংগ্রহ সহজ হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণে আসছে ডিজিটাল ব্যবস্থা

বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে কোম্পানির সংঘস্মারক সংশোধনে আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে নিবন্ধকের অনুমোদনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, নতুন ব্যবসা যুক্ত করা কিংবা প্রতিষ্ঠান বিক্রি ও একীভূত করার প্রক্রিয়া সহজ হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পাওনাদারদের স্বার্থ সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নিবন্ধকের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করা যাবে।

এ ছাড়া কাগজের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে নথি, নোটিশ ও চুক্তি সংরক্ষণ এবং শেয়ার হস্তান্তরের সত্যতা ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

বাড়ছে জরিমানা, সুযোগ পাবেন উদ্যোক্তারা

বিদ্যমান কোম্পানির নামের সঙ্গে বিভ্রান্তিকরভাবে মিলে যায়, এমন নাম পরিবর্তনের সরকারি নির্দেশ অমান্য করলে জরিমানা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কোম্পানির দৈনিক জরিমানা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জরিমানা ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করার কথা রয়েছে।

একক মালিকানার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এক ব্যক্তির কোম্পানি গঠনের বিধানও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খসড়াটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর এটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সংসদে উত্থাপন করা হবে।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, কোম্পানি আইনকে যুগোপযোগী করা অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল। আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আরজেএসসিকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার পাশাপাশি দপ্তরটির সেবা অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার রায় ১৯ নভেম্বর

Business Times24

বেনামি মালিকানায় লাগাম, বদলাচ্ছে ৩৫ বছরের কোম্পানি আইন

Update Time : ১০:৪৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

কাগজে কোম্পানির শেয়ার একজনের নামে, অথচ আড়াল থেকে প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছেন অন্য কেউ—এমন গোপন মালিকানার সুযোগ বন্ধ করতে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন বিধান কার্যকর হলে কোম্পানির প্রকৃত মালিক ও নিয়ন্ত্রণকারীর পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল নিবন্ধন, নথি সংরক্ষণ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ জন্য ১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইনের ৪০টি ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আইন প্রণয়নের প্রায় ৩৫ বছর পর বড় পরিসরে সংশোধনের এ উদ্যোগে প্রকৃত মালিকানা শনাক্তকরণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বেনামি মালিকানায় অনিয়মের ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক গেটওয়ে কোম্পানি ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কে টেল লিমিটেডের প্রায় ১২৬ কোটি টাকার টেলিযোগাযোগ বিল বকেয়া থাকার ঘটনা গোপন মালিকানার ঝুঁকি সামনে এনেছিল। কোম্পানিটির মালিকানা তিন ব্যক্তির নামে হস্তান্তর দেখানো হলেও তাঁদের একজন সাখাওয়াত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত মালিককে শনাক্ত করার নির্দেশ দেন। পরবর্তী তদন্তে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ব্যাংক খাতেও গোপন মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত শেয়ার ছিল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২২ শতাংশ। এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও ঋণ বিতরণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

প্রকৃত মালিকের পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক

সংশোধনী খসড়ায় নতুন ৩৪(ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে কাগজে শেয়ারধারী ব্যক্তির পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও প্রকৃত মালিক হিসেবে গণ্য করা হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, মালিকানা পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন ঘোষণা দিতে হবে। নির্ধারিত ফরমে এসব তথ্য নিবন্ধকের কাছে জমা দিতে হবে। প্রকৃত মালিকানার ঘোষণা না দিলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। নিয়ম অমান্য অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০০ টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

এ বিধান কার্যকর হলে অন্যের নামে শেয়ার রেখে প্রকৃত মালিকানা গোপন করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য তথ্য সংগ্রহ সহজ হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণে আসছে ডিজিটাল ব্যবস্থা

বর্তমানে যেসব ক্ষেত্রে কোম্পানির সংঘস্মারক সংশোধনে আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রে নিবন্ধকের অনুমোদনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, নতুন ব্যবসা যুক্ত করা কিংবা প্রতিষ্ঠান বিক্রি ও একীভূত করার প্রক্রিয়া সহজ হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পাওনাদারদের স্বার্থ সুরক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নিবন্ধকের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করা যাবে।

এ ছাড়া কাগজের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে নথি, নোটিশ ও চুক্তি সংরক্ষণ এবং শেয়ার হস্তান্তরের সত্যতা ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

বাড়ছে জরিমানা, সুযোগ পাবেন উদ্যোক্তারা

বিদ্যমান কোম্পানির নামের সঙ্গে বিভ্রান্তিকরভাবে মিলে যায়, এমন নাম পরিবর্তনের সরকারি নির্দেশ অমান্য করলে জরিমানা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কোম্পানির দৈনিক জরিমানা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জরিমানা ১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা করার কথা রয়েছে।

একক মালিকানার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এক ব্যক্তির কোম্পানি গঠনের বিধানও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খসড়াটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর এটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে। অনুমোদন পেলে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সংসদে উত্থাপন করা হবে।

এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, কোম্পানি আইনকে যুগোপযোগী করা অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল। আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে আরজেএসসিকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার পাশাপাশি দপ্তরটির সেবা অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।