ভাবুন তো, রাতের বেলা হঠাৎ মনে হলো ঘরে দুধ নেই, সকালে নাশতার জন্য ডিমও ফুরিয়ে গেছে। দোকানে যাওয়ার আলসেমি কাটিয়ে ওঠার আগেই দরজায় হাজির প্রয়োজনীয় পণ্য! শহুরে জীবনের এই ছোট্ট অভ্যাসই যে একদিন দুই তরুণকে ভারতের সবচেয়ে আলোচিত তরুণ উদ্যোক্তাদের কাতারে নিয়ে যাবে, তা কি তারা নিজেরাও ভেবেছিলেন?
গল্পের দুই নায়ক আদিত পালিচা ও কৈবল্য ভোহরা। একজনের বয়স ২৪, অন্যজনের ২৩। তাদের তৈরি প্রতিষ্ঠান জেপ্টো এখন ভারতের দ্রুত পণ্য সরবরাহের ব্যবসায় অন্যতম আলোচিত নাম। ২০২৬ সালের হুরুন ইন্ডিয়া ধনী ব্যক্তিদের তালিকা অনুযায়ী, কৈবল্যের আনুমানিক সম্পদ ২ হাজার ৬০০ কোটি রুপি, আর আদিতের ৩ হাজার ৫০০ কোটি রুপি।
স্ট্যানফোর্ডের স্বপ্ন ছেড়ে ব্যবসার পথে
কৈবল্য ও আদিতের বন্ধুত্ব শৈশবের। প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহও ছিল দুজনের। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তারা। কিন্তু প্রচলিত পথে এগোনোর বদলে তাদের মাথায় চেপে বসে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন।
করোনার সময় যখন লকডাউনে মানুষের স্বাভাবিক জীবন থমকে গিয়েছিল, তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সমস্যাটিকে তারা ব্যবসার সুযোগ হিসেবে দেখেন। প্রথমে শুরু করেন কিরানাকার্ট। পরে ব্যবসার ধরন পাল্টে ২০২১ সালে যাত্রা শুরু করে জেপ্টো।
দশ মিনিটের প্রতিশ্রুতিতে বদলে গেল কেনাকাটা
জেপ্টোর ব্যবসার মূল আকর্ষণ দ্রুত সরবরাহ। চাল, ডাল, দুধ, ফল কিংবা ঘরের প্রয়োজনীয় পণ্য—মোবাইলে অর্ডার দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে হাতে পাওয়ার সুবিধা শহুরে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেছে।
এই দ্রুততার পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি, পণ্যের মজুত ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকের কাছাকাছি ছোট গুদামভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থা। অর্থাৎ, শুধু অ্যাপ বানালেই হয় না; পণ্য কোথায় থাকবে, কখন প্যাক হবে, কোন পথে পৌঁছাবে—সবকিছুর হিসাব রাখতে হয়।
সাফল্যের চকচকে দিকের আড়ালেও হিসাব আছে
কোটি কোটি রুপির সম্পদের গল্প শুনতে যতটা রোমাঞ্চকর, ব্যবসা চালানোর বাস্তবতা ততটা সহজ নয়। ২০২৬ অর্থবছরে জেপ্টোর পরিচালন আয় বেড়ে ২২ হাজার ৬২৪ কোটি রুপি হলেও ব্যয়ও বেড়েছে। কোম্পানিটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯০৫ কোটি রুপি।
অর্থাৎ, বিপুল আয় মানেই বিপুল মুনাফা নয়। কর্মী, গুদাম, পণ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। প্রতিযোগিতার বাজারে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
তরুণদের জন্য কী বার্তা?
কৈবল্য ও আদিতের গল্পের আসল আকর্ষণ তাদের বয়স কিংবা সম্পদের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেখিয়েছেন, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ সমস্যাও বড় ব্যবসার ধারণায় পরিণত হতে পারে। তবে সেই ধারণাকে সফল করতে প্রয়োজন পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিনিয়োগ এবং কঠোর পরিশ্রম।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা তাই শুধু কে কত কোটি টাকার মালিক, তা নয়। বরং কে মানুষের প্রয়োজন বুঝে এমন সমাধান তৈরি করতে পারছেন, যা পুরো বাজারের আচরণ বদলে দিতে পারে। নতুন বিশ্ব অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের বড় শক্তি সম্ভবত সেখানেই।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















