বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করেছে সরকার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন ঋণ পাওয়ার বিষয়ে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বৈঠক করে নতুন অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তির বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আইএমএফের ঋণ নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের দেওয়া প্রস্তাবের চূড়ান্ত পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য শিগগিরই দুই পক্ষ বৈঠকে বসবে। নতুন ঋণের বিষয়ে সরকার আশাবাদী বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশকে অর্থায়নের বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় এসব সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে সরকার।
পাঁচ বছরের উন্নয়ন কাঠামো
বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব কাঠামো চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সরকারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বৈঠকে চুক্তির বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী জানান, চুক্তির মূল নীতিগত বিষয়গুলোতে কোনো সমস্যা নেই। আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে সেগুলো চূড়ান্ত রূপ পাবে, তা যৌথ কর্মপরিকল্পনায় নির্ধারণ করা হবে।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। এ কাঠামোর মাধ্যমে সরকারের অগ্রাধিকার, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সমন্বিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন কাজে লাগাতে চায় সরকার। তবে প্রস্তাবিত চুক্তির অর্থায়নের পরিমাণ, শর্ত ও প্রকল্পভিত্তিক অগ্রাধিকার চূড়ান্ত হওয়ার পরই এর বাস্তবায়ন কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
আর্থিক খাতের সংস্কার ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক অব আমেরিকা, গুগল, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও মুডিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণসংক্রান্ত বিষয় এবং আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি বছর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে। এ বিবেচনায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আর্থিক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে নীতিগত সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অর্থায়নের সুফল কাজে লাগাতে সহায়ক হতে পারে।
বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ
বার্ষিক সভার পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ নতুন করে কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন। বিপরীতে এ সময়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি মানুষের জন্য।
এ পরিস্থিতিতে বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থায়ন ও অংশীদারত্বের আলোচনা এসব ক্ষেত্রে সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে প্রয়োজন হবে কার্যকর প্রকল্প নির্বাচন, সংস্কারের ধারাবাহিকতা এবং অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার।
আইএমএফের ঋণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব কাঠামো নির্ধারণ—দুটি উদ্যোগই বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থায়নের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক হলেও চূড়ান্ত শর্ত, অর্থায়নের পরিমাণ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশের পরই দেশের অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















