পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলের শিল্পায়ন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যে বড় স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন এখনো অনেক দূরে। গত ১৩ বছরে বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নে ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখনো সীমিত। বর্তমানে বন্দরের আমদানি কার্যক্রমের প্রায় পুরোটাই একটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা খালাসকে ঘিরে।
২০১৩ সালে টিয়াখালীতে পায়রা বন্দরের যাত্রা শুরু হয়। পরিকল্পনা ছিল বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন জেটি, স্মার্ট সিটি এবং আমদানি-রপ্তানির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। ২০২৩ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরিকল্পনার বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
জাহাজ আসে, রপ্তানি নেই
২০২৫-২৬ অর্থবছরে পায়রা বন্দরে ২ হাজার ৯৬২টি জাহাজ এসেছে। এর মধ্যে বিদেশি জাহাজ মাত্র ২৯টি। একই সময়ে বন্দর দিয়ে ৫৫ লাখ টন পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
তবে আমদানি পণ্যের প্রায় পুরোটাই তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা। পাথর ও সিমেন্টের মতো অন্যান্য পণ্যের পরিমাণ খুবই কম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সময়ে বন্দর দিয়ে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। আমদানি করা পণ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই দেশীয় জাহাজে পরিবহন হয়েছে।
ফলে বড় অবকাঠামো থাকলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র হিসেবে এখনো গড়ে উঠতে পারেনি পায়রা।
নাব্যতা সংকট বড় বাধা
বন্দরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাবনাবাদ চ্যানেলের নাব্যতা। বড় জাহাজ চলাচলের উপযোগী রাখতে চ্যানেলের গভীরতা ১০ দশমিক ৫ মিটার করার লক্ষ্য থাকলেও বর্ষায় অনেক সময় তা ৫ থেকে ৬ মিটারে নেমে আসে।
বন্দর উদ্বোধনের সময় চ্যানেলের গভীরতা ছিল ৭ দশমিক ৩ মিটার। বর্তমানে তা প্রায় ৫ দশমিক ৩ মিটারে নেমেছে।
চ্যানেল উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে নেওয়া হয়েছে।
স্থায়ীভাবে নাব্যতা ধরে রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ড্রেজার কেনা ও নিয়মিত খননের জন্য আরও ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ছে
নাব্যতা কম থাকায় বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভিড়তে পারে না। গভীর সমুদ্র থেকে আসা জাহাজ থেকে পণ্য ছোট জাহাজে স্থানান্তর করে বন্দরে আনতে হয়। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বাড়ে।
এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী পায়রা বন্দর ব্যবহারের পরিবর্তে বিকল্প বন্দর ও পরিবহনপথ বেছে নিচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে প্রবেশের ব্যবস্থা করা না গেলে পায়রার বাণিজ্যিক সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন।
অবকাঠামো আছে, শিল্পভিত্তি নেই
পায়রা বন্দরে ৬৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি, ৩ লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটারের ব্যাকআপ ইয়ার্ড এবং ১০ হাজার বর্গমিটারের কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন রয়েছে। অবকাঠামোগুলো একসঙ্গে ১৫টি জাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বিবেচনায় তৈরি করা হয়েছে।
কিন্তু বন্দরের আশপাশে সেই অনুপাতে শিল্পকারখানা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি। ফলে অবকাঠামোর সক্ষমতার সঙ্গে বাস্তব ব্যবহার মেলেনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের মতে, বন্দরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিল্পভিত্তি গড়ে না উঠলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির স্থায়ী চাহিদা তৈরি হবে না।
যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা
তবে পায়রা বন্দরের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে বন্দরের কার্যক্রম বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
আন্দারমানিক নদীর ওপর প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন চার লেনের সেতুর কাজ প্রায় ৯৪ শতাংশ শেষ হয়েছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রায় ১ হাজার ১৮০ মিটার দীর্ঘ এই সেতু পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল চাড়িপাড়াকে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত নতুন ছয় লেনের সড়কের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এতে বন্দরের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শিল্পায়নের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সৈয়দ সাইফ উল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে বন্দরটি মূলত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তবে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির জন্য বন্দরটি প্রস্তুত।
তার মতে, এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে রাবনাবাদ চ্যানেলের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বন্দরের আশপাশে শিল্প স্থাপন এবং ভাঙ্গা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ উন্নত করা প্রয়োজন। পটুয়াখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে বন্দরের ব্যবহারও বাড়তে পারে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনায় মোট ছয়টি টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে একটি বহুমুখী টার্মিনাল ইতোমধ্যে প্রস্তুত। অন্য টার্মিনালগুলোর নির্মাণকাজ আগামী দুই বছরের মধ্যে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প ও বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগও চলছে। ভবিষ্যতে চাহিদা তৈরি হলে রেল ও বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সব মিলিয়ে পায়রা বন্দরের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ নতুন অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে বিদ্যমান অবকাঠামোর পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা। নাব্যতা রক্ষা, শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং নিয়মিত বাণিজ্যিক পণ্য প্রবাহ তৈরি করতে পারলেই বড় বিনিয়োগের এই বন্দর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























