পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবসা ও মুনাফার চিত্রে দুর্বলতা থাকলেও আবারও বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর এবার ৯৬৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা সংগ্রহে রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব করেছে তারা।কোম্পানিটির পর্ষদ প্রতিটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে দুটি করে রাইট শেয়ার ইস্যু করতে চায়। প্রতিটি রাইট শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা। এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে কোম্পানিটি প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকা নতুন মূলধন সংগ্রহ করবে।
অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিপিএইচ ইস্পাতের শেয়ারপ্রতি আয় বা মুনাফা হয়েছে মাত্র ৭ পয়সা। কোম্পানিটির ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৫১ টাকা ৮১ পয়সা। এ অবস্থায় এত বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা ও অর্থের ব্যবহার নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আগের রাইট ও প্রেফারেন্স প্রস্তাব বাতিল করেছিল বিএসইসি জিপিএইচ ইস্পাতের নতুন রাইট শেয়ার প্রস্তাবের বিষয়টি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন কোম্পানিটির আগের মূলধন উত্তোলনের আবেদনসমূহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক বাতিল করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের ২৭ মে বিএসইসি জিপিএইচ ইস্পাতের রাইট শেয়ার ইস্যুর প্রস্তাব বাতিল করে। তখন কোম্পানিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ১৬ কোটি ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৮৫টি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে ১:৩ অনুপাতে রাইট শেয়ার ইস্যু করে প্রায় ২৪১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা সংগ্রহের আবেদন করেছিল।
কমিশন জানিয়েছিল, দাখিল করা দলিলাদি সন্তোষজনক না হওয়ায় সার্বিক দিক বিবেচনায় প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়েছে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২২ জুন ২০২৫, কোম্পানিটির ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের প্রেফারেন্স শেয়ার (অগ্রাধিকারমূলক শেয়ার) ইস্যুর প্রস্তাবও বাতিল করে বিএসইসি।
ব্যাংক ঋণ পরিশোধের জন্য কোম্পানিটি ওই অর্থ সংগ্রহ করতে চেয়েছিল।অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে মূলধন সংগ্রহের একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে জিপিএইচ ইস্পাত। আগের দুটি প্রস্তাব নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন না পেলেও এবার আগের চেয়েও বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলো।
বিএসইসি চেয়ারম্যানের পুরোনো সংশ্লিষ্টতা ঘিরে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন জিপিএইচ ইস্পাতের নতুন রাইট শেয়ার প্রস্তাবের সময় বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খানের আগের পেশাগত সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও শেয়ারবাজারে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে মাসুদ খান ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে জিপিএইচ ইস্পাতের নিবন্ধিত কার্যালয়ও ‘ক্রাউন চেম্বার’-এ অবস্থিত এবং কোম্পানিটির করপোরেট তথ্য অনুযায়ী এর কারখানা চট্টগ্রামের কুমিরায়।ফলে কোম্পানিটির নতুন এই বিশাল রাইট শেয়ার প্রস্তাবকে ঘিরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) নিয়ে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে।
২% লভ্যাংশ ও বাজার প্রতিক্রিয়া২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিপিএইচ ইস্পাতের পর্ষদ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রস্তাবিত লভ্যাংশ ও অন্যান্য এজেন্ডা অনুমোদনের জন্য আগামী ২৫ অক্টোবর বার্ষিক সাধারণ সভা (AGM) হবে। এর জন্য রেকর্ড তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ অক্টোবর।
একদিকে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি মুনাফা মাত্র ৭ পয়সা এবং লভ্যাংশ ২ শতাংশ, অন্যদিকে একই সময়ে প্রায় ৯৬৮ কোটি টাকার নতুন মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ—এ দুইয়ের বৈপরীত্য ভাবিয়ে তুলছে বাজার বিশ্লেষকদের।
জিপিএইচ ইস্পাতের এই নতুন রাইট শেয়ার প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন হওয়া না-হওয়া এখন সম্পূর্ণভাবে বিএসইসির চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।
আগের বাতিলের ঘাটতিগুলো এবার কতটা মেটানো সম্ভব হয়েছে এবং নতুন প্রস্তাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে—সেদিকেই এখন নজর পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সকলের।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























