বৃষ্টির পানি, ঢেউ ও স্রোতের আঘাতে প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন ঢালু এলাকা, নদীতীর ও বাঁধ। এই ক্ষয় ঠেকাতে এবার প্রাকৃতিক সমাধানের দিকে নজর দিয়েছে সরকার। কম খরচে মাটি আঁকড়ে ধরে রাখতে সক্ষম বিন্না ঘাস দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে লাগানোর সম্ভাবনা যাচাইয়ে গঠন করা হয়েছে ৩৪ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি।
গত ৫ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের নেতৃত্বে কমিটি বিন্না ঘাস ব্যবহারের কার্যকারিতা, সম্ভাব্যতা ও ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবে।
সড়ক, মহাসড়ক, নদী ও খালের পাড়, হাওর এবং বাঁধ এলাকায় বিন্না ঘাস লাগানো কতটা কার্যকর হবে, তা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি প্রতি কিলোমিটারে সম্ভাব্য ব্যয়, ঘাস লাগাতে প্রয়োজনীয় জায়গা এবং তিন পার্বত্য জেলার সড়কের ঢাল, লেকের পাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে এর ব্যবহার নিয়েও সমীক্ষা করা হবে।
কমিটিতে পরিকল্পনা কমিশন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রয়েছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলামও কমিটির সদস্য। পরিকল্পনা বিভাগের সচিব সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রয়োজন হলে কমিটি অতিরিক্ত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। কমিটিকে অবিলম্বে কাজ শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গভীর শিকড়ে মাটি আঁকড়ে ধরে
বিন্না বা ভেটিভার একধরনের বহুবর্ষজীবী ঘাস। বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই এটি জন্মে এবং লবণাক্ত বালু থেকে পলিমাটি—বিভিন্ন ধরনের মাটিতে বেড়ে উঠতে পারে।
এর ঘন ও গভীর শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। একই সঙ্গে পানির প্রবাহের গতি কমিয়ে পলি আটকে রাখে। ফলে বৃষ্টির পানি, ঢেউ ও স্রোতের কারণে ভূমিক্ষয় কমানোর পাশাপাশি ঢালু জমি স্থিতিশীল রাখতে এটি সহায়ক হতে পারে।
বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে ভূমিক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস ব্যবহার করা হয়। ১৯৮০-এর দশকে মাটি ও পানি সংরক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাংক ‘ভেটিভার সিস্টেম’ নিয়ে কাজ শুরু করে। পরে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বিভিন্ন দেশে এটি সাশ্রয়ী মাটি সংরক্ষণ পদ্ধতি হিসেবে জনপ্রিয় হয়।
বাংলাদেশেও উপকূলীয় বাঁধ, নদী-খালের পাড় ও পাহাড়ি এলাকায় বিন্না ঘাসের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০১৮ সালে বর্ষা মৌসুমে ভূমিক্ষয় ও ভূমিধসের ঝুঁকি কমাতে দক্ষিণ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরগুলোতে কয়েক লাখ বিন্না ঘাসের চারা বিতরণ করেছিল জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম।
সরকারের গঠিত কারিগরি কমিটির মূল্যায়নে বিন্না ঘাসের কার্যকারিতা ও ব্যয়-সাশ্রয়ী ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্ট হলে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল, বাঁধ ও নদীতীর রক্ষায় এটি নতুন একটি পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























