চকোলেট মানেই জিভে মিষ্টি হাসি। কিন্তু সেই চকোলেট যদি মুখে দিয়েই মনে হয়—‘এটা কি চকোলেট, নাকি তেতো ওষুধ?’ তাহলে বুঝতে হবে আপনি চলে গেছেন চকোলেটের একেবারে অন্ধকার গলিতে! নাম তার ১০০ শতাংশ ডার্ক চকোলেট।
সাধারণ দুধ চকোলেট যেখানে চিনি আর মিষ্টির মায়াজালে আটকে রাখে, সেখানে ১০০ শতাংশ কোকো চকোলেট যেন উল্টো পথের যাত্রী। চিনি নেই বললেই চলে, কোকোর তীব্র স্বাদই এখানে মূল নায়ক। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের বাজারে লিন্ডটের নতুন ১০০ শতাংশ কোকো ডার্ক চকোলেট আসার পর আবারও আলোচনায় এসেছে—চকোলেট কি সত্যিই স্বাস্থ্যকর হতে পারে?
পুষ্টিবিদদের উত্তর—হ্যাঁ, তবে শর্ত আছে।
খালি মিষ্টি নয়, আছে খনিজও
চকোলেটকে এত দিন হয়তো ‘মিষ্টি খাবার’ বলেই চিনেছেন। কিন্তু বেশি কোকোযুক্ত ডার্ক চকোলেটের ভেতরে রয়েছে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় খনিজ।
পুষ্টিবিদ ডা. ফেদেরিকা আমাতির মতে, ডার্ক চকোলেটে কপার, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম ও জিংকের মতো খনিজ থাকে। সামান্য পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, ই ও কেও পাওয়া যায়।
অবশ্য তাই বলে চকোলেটের বার হাতে নিয়ে ‘আজ আর ভিটামিন খেতে হবে না’—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। চকোলেট কোনো মাল্টিভিটামিনের বিকল্প নয়।
পেটের খবরও রাখে!
চকোলেটের সঙ্গে আঁশের সম্পর্ক আছে—শুনে অনেকেরই ভুরু কুঁচকে যেতে পারে। কিন্তু বেশি কোকোযুক্ত ডার্ক চকোলেটে খাদ্যআঁশ থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
কোকোতে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্যও সহায়ক হতে পারে।
অর্থাৎ, সবজি খাওয়ার প্লেটের জায়গা অবশ্যই চকোলেট দখল করতে পারবে না। তবে পরিমিত ডার্ক চকোলেট খাদ্যতালিকায় কিছু উপকারী উদ্ভিজ্জ উপাদান যোগ করতে পারে।
হৃদয়ের জন্য ভালো? একটু থামুন!
ডার্ক চকোলেটের সবচেয়ে আলোচিত গুণ সম্ভবত হৃদস্বাস্থ্য নিয়ে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কোকোর নির্দিষ্ট যৌগ রক্তনালির কার্যকারিতা ও রক্তচাপের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কোকোতে থাকা পলিফেনল রক্তপ্রবাহ ও কোলেস্টেরলের স্বাস্থ্যকর মাত্রার সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কিন্তু এখানেই বড় একটি ‘কিন্তু’ আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সম্ভাব্য উপকারকে বাড়িয়ে দেখা ঠিক নয়। ডার্ক চকোলেট উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ নয়, হৃদরোগের চিকিৎসাও নয়। তাই ‘প্রতিদিন চকোলেট খেলেই হৃদয় থাকবে ফিট’—এমন সরল সমীকরণে বিশ্বাস করার কারণ নেই।
চর্বি আছে, তবে গল্পটা পুরো কালো নয়
চকোলেটে স্যাচুরেটেড ফ্যাট আছে। শুনেই অনেকে হয়তো চকোলেটকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু কোকো বাটারে থাকা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বড় একটি অংশ স্টিয়ারিক অ্যাসিড, যা অন্যান্য কিছু স্যাচুরেটেড ফ্যাটের তুলনায় কোলেস্টেরলের ওপর তুলনামূলক নিরপেক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এখানেও ছাড় নেই। চকোলেট মানেই ক্যালরি ও চর্বি—তাই ‘ডার্ক’ নাম দেখে যত খুশি খাওয়ার লাইসেন্স পাওয়া যায় না।
৭০ শতাংশ, নাকি ১০০ শতাংশ?
এখন আসল প্রশ্ন—১০০ শতাংশ কোকো হলেই কি ৭০ বা ৮৫ শতাংশের চেয়ে স্বাস্থ্যকর?
উত্তরটা এত সরল নয়।
কোকোর পরিমাণ যত বাড়ে, সাধারণত চিনি যোগ করার জায়গা তত কমে। তাই বিশেষজ্ঞরা অন্তত ৭০ শতাংশ কোকোযুক্ত এবং কম চিনি ও কম অপ্রয়োজনীয় উপাদান থাকা চকোলেট বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এখানে প্যাকেটের সামনের বড় বড় অঙ্কের চেয়ে পেছনের উপাদান তালিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ‘ডার্ক চকোলেট’ লেখা থাকলেই সেটি স্বাস্থ্যকর হয়ে যায় না। অনেক ডার্ক চকোলেটেই যথেষ্ট পরিমাণ পরিশোধিত চিনি ও বিভিন্ন সংযোজক থাকতে পারে।
দিনে কতটুকু?
এখানে চকোলেটপ্রেমীদের জন্য সুখবরও আছে, আবার লাগামও আছে।
ডা. আমাতির পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ২০ গ্রাম, অর্থাৎ এক থেকে দুই টুকরা ডার্ক চকোলেট যথেষ্ট হতে পারে।
মানে পুরো বার খুলে ‘আজ স্বাস্থ্যচর্চা করছি’ বলে এক বসায় শেষ করে দেওয়া যাবে না!
কারণ বেশি খেলে চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যাবে। আবার কোকো পণ্যে উৎসভেদে অতি সামান্য ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।
১০০ শতাংশ চকোলেটের আসল সমস্যা—তেতো স্বাদ!
১০০ শতাংশ ডার্ক চকোলেটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অবশ্য পুষ্টিগুণ নয়, জিহ্বা।
চিনি না থাকায় এর স্বাদ অত্যন্ত তীব্র ও তেতো। দুধ চকোলেটের মিষ্টি আদর এখানে নেই। বরং প্রথম কামড়েই মনে হতে পারে—‘চকোলেটের এত রাগ কেন?’
তবে যাঁরা তীব্র কোকোর স্বাদ পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে এই তেতো স্বাদই আবার বিলাসিতা।
লিন্ডটের নতুন ১০০ শতাংশ কোকো বারও এই তীব্র কোকো স্বাদ ও মসৃণ টেক্সচারকে সামনে এনেছে। শুধু খাওয়াই নয়, রান্না ও বেকিংয়েও এটি ব্যবহার করা যায়।
তাহলে চকোলেট খাবেন, নাকি দূরে থাকবেন?
চকোলেটকে একেবারে ‘স্বাস্থ্যের শত্রু’ বানানোর যেমন কারণ নেই, তেমনি একে ‘স্বাস্থ্যকর খাবারের রাজা’ বানানোরও দরকার নেই।
বিশেষজ্ঞদের মূল পরামর্শ হলো—কম চিনি, বেশি কোকো এবং কম অপ্রয়োজনীয় সংযোজকযুক্ত ডার্ক চকোলেট বেছে নিন।
৭০ শতাংশ বা তার বেশি কোকোযুক্ত চকোলেটই ভালো বিকল্প হতে পারে। ১০০ শতাংশ কোকো পছন্দ হলে সেটিও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যায়।
শেষ কথা একটাই—চকোলেট স্বাস্থ্যকর হতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যকর বলে বেশি চকোলেট খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়।
তাই চকোলেটের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকুক, তবে দূরত্বটাও থাকুক। দিনে এক-দুই টুকরার সম্পর্কই বরং দীর্ঘস্থায়ী!

নিজস্ব প্রতিবেদক 





















