সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন হাট-বাজারে নতুন পাট কেনাবেচা পুরোদমে শুরু হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার বাজারে পাটের দাম কিছুটা বেশি হলেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখছেন না স্থানীয় কৃষকেরা। সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের চড়া মজুরির পাশাপাশি অতিবৃষ্টির কারণে ফলন কমে যাওয়ায় বাড়তি দামের সুফল মিলছে না তাঁদের। ফলে এক সময়ের ‘সোনালি আঁশ’ এখন অনেক কৃষকের কাছে লাভের চেয়ে টিকে থাকার ফসলে পরিণত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জের ৯টি উপজেলায় ১৪ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। এ বছর জেলায় মোট পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ১৩৮ বেল।
সরেজমিনে সদর, কাজীপুর, রায়গঞ্জ, কামারখন্দ, বেলকুচি, তাড়াশ, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা এখন পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও বাজারজাতকরণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গুণগতমান অনুযায়ী বর্তমানে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাটের দাম ছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা।
দাম বাড়লেও কৃষকদের অসন্তোষ ও শঙ্কার কারণ উৎপাদন খরচ। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, অতিবৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় পাটগাছ স্বাভাবিক উচ্চতা অর্জন করতে পারেনি। সাধারণত পাটগাছ ৭ থেকে ১২ ফুট উঁচু হলেও এবার তা ২ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত কম হয়েছে। এতে বিঘাপ্রতি গড়ে ৪০ থেকে ৫৫ কেজি (২ থেকে ৩ মণ) পর্যন্ত পাটের উৎপাদন কমে গেছে।
রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা বাজারে আসা ধানগড়া গ্রামের কৃষক রেজাউল শেখ জানান, বর্তমানে তিনি প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তবে সার, তেল ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এবং আগামীতে দাম স্থিতিশীল থাকবে কি না—তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “পাট চাষ করে তেমন লাভ হচ্ছে না, তাই ধীরে ধীরে আগ্রহ হারাচ্ছি।”
একই উপজেলার পাঙ্গাসী গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, এবার এক বিঘা জমিতে তাঁর ৬ মণ পাট হয়েছে। ৪ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে মোট ২৫ হাজার ২০০ টাকা পেলেও নিজের শ্রম বাদ দিয়েই খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ তিন মাস পরিশ্রম করে বিঘা প্রতি লাভ থাকছে মাত্র ৭ হাজার টাকার মতো।
কাজীপুর ও উল্লাপাড়ার কৃষকদের মতে, প্রতি মণ পাট উৎপাদনে খরচই পড়ে যাচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকা। পাটের আঁশ ও পাটকাঠি সংসারের নানা কাজে লাগে বলেই অনেকে বাধ্য হয়ে এখনো চাষ করছেন। সঠিক দাম ও লাভ না পেলে আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ আরও কমিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন তাঁরা।
এদিকে কাজীপুরের পাট ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, কৃষকদের কাছ থেকে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় পাট কিনে পরিবহন খরচ বাদ দিয়ে মণে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লাভে মহাজনদের কাছে বিক্রি করছেন। অর্থাৎ কৃষক থেকে ব্যবসায়ী—পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাতেই ব্যয়ের চাপ রয়েছে।
তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, “পাটের বর্তমান বাজারদর কৃষকের জন্য ইতিবাচক। অতিবৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় উৎপাদন কম হলেও অনেক স্থানে ফলন সন্তোষজনক হয়েছে। সামগ্রিকভাবে কৃষকেরা লাভবান হবেন বলেই আশা করছি।”
কৃষকদের দাবি, বাজারে পাটের ন্যায্য ও স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করা না গেলে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী অর্থকরী ফসলের উৎপাদন ভবিষ্যতে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 

























