এসইএমএল আইবিবিএল শরিয়াহ ফান্ডের প্রায় ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার মেয়াদি আমানত ফেরত পাওয়া ও তার সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে ফান্ডটির প্রায় দেড় কোটি টাকার বিনিয়োগের ন্যায্যমূল্য শূন্য ধরে পুরো অর্থের বিপরীতে ক্ষতির সঞ্চিতি রাখা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে নিরীক্ষক এই দুটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকে ফান্ডটির দুটি Mudaraba Term Deposit Receipt বা MTDR-এর মূল অর্থ ছিল মোট ১১ কোটি ৩ লাখ ৫৫ হাজার ১২২ টাকা। এর মধ্যে একটি আমানত ৫ কোটি টাকা এবং অন্যটি ৬ কোটি ৩ লাখ ৫৫ হাজার ১২২ টাকা। ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত এই অর্থ ফান্ডটির মোট সম্পদের প্রায় ১০.৯১ শতাংশ। এক্সিম ব্যাংক রেজল্যুশন ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় এই মূল অর্থ কতটা, কীভাবে এবং কখন নগদে ফেরত পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন নিরীক্ষক। তবে ৩০ জুনের আর্থিক বিবরণীতে এই MTDR-এর মূল অর্থের বিপরীতে কোনো impairment provision রাখা হয়নি।
এখানেই ১১ কোটি টাকা ও ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকার দুই অঙ্কের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এক্সিম ব্যাংকের দেওয়া নিশ্চিতকরণ অনুযায়ী, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে ওই দুই হিসাবের স্থিতি ছিল যথাক্রমে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ২৫৪ টাকা ১৭ পয়সা এবং ৬ কোটি ৭১ লাখ ২৯ হাজার ৪১৯ টাকা ৭৩ পয়সা। অর্থাৎ মোট ব্যাংক ব্যালান্স প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। কিন্তু ফান্ডটি ২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্জিত মুনাফাই আয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে; এরপর জমা হওয়া মুনাফা আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে হিসাবের আয় হিসেবে দেখানো হয়নি। ফলে ১১ কোটি ৩ লাখ টাকা হচ্ছে মূল MTDR, আর প্রায় ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যাংকের নিশ্চিত করা মোট হিসাবস্থিতি।
অনিশ্চয়তাটি শুধু একটি দুর্বল ব্যাংকে টাকা আটকে থাকার সাধারণ ঘটনা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত সংশোধিত Bank Resolution Scheme, 2025-এ ‘প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী’র সংজ্ঞায় কোম্পানি, করপোরেশন, সোসাইটি ও ট্রাস্টসহ আইনগত প্রতিষ্ঠান রাখা হয়েছে। স্কিমে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের একটি অংশ নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে রূপান্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শেয়ারমূল্য সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট মেয়াদি আমানত পাঁচ বছরের মেয়াদে পুনর্বিন্যাসের বিধানও রয়েছে, যেখানে নির্ধারিত হারে মুনাফা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ফান্ডটির এক্সিম ব্যাংক আমানতের শেষ পর্যন্ত কত অংশ নগদে ফিরবে, কত অংশ অন্য কাঠামোয় যাবে এবং সময়সীমা কী হবে, সেটিই মূল ঝুঁকি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ৩১ আগস্ট অ-প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের জন্য মূল অর্থ উত্তোলনের সুযোগ আরও শিথিল করেছে। তবে ওই নির্দেশনা স্পষ্টভাবেই non-institutional deposits নিয়ে। ফলে ব্যক্তি আমানতকারীদের জন্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ বাড়লেও সেটি এসইএমএল আইবিবিএল শরিয়াহ ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের MTDR ফেরতের প্রশ্ন সরাসরি মিটিয়ে দেয় না।
ফান্ডটির দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার। ৩০ জুন ২০২৬-এর পোর্টফোলিও বিবরণী অনুযায়ী, ফান্ডটির কাছে ব্যাংকটির ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ২১১টি শেয়ার ছিল। শেয়ারগুলোর মোট ক্রয়মূল্য ১ কোটি ৪৯ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ টাকা হলেও ওই তারিখে বাজারমূল্য ধরা হয়েছে শূন্য। অর্থাৎ এই বিনিয়োগে ১০০ শতাংশ মূল্যহ্রাস দেখানো হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও পুরো ১ কোটি ৪৯ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ টাকার বিপরীতে provision বা impairment স্বীকৃত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এই শূন্য মূল্যায়ন কেবল ফান্ড ম্যানেজারের অনুমান নয়। এক্সিম, গ্লোবাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের নভেম্বরে non-viable ঘোষণা করার পর পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিত হয়। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান CSE তথ্যেও বাজার মূলধন শূন্য দেখানো হচ্ছে। পাঁচ ব্যাংকের সম্পদ ও দায় পরে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে নেওয়া হয়েছে।
তবে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের দেড় কোটি টাকার বিনিয়োগই ফান্ডটির শেয়ারবাজারের একমাত্র ক্ষতি নয়। ৩০ জুনের পোর্টফোলিওতে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত মূলধনবাজারের সিকিউরিটিজের মোট ক্রয়মূল্য ছিল প্রায় ৮১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যার বাজারমূল্য নেমে আসে প্রায় ৬৪ কোটি ৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে প্রায় ১৭ কোটি ৮৬ লাখ টাকার, বা ২১.৮০ শতাংশ, মূল্যহ্রাস ছিল। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার সেই বৃহত্তর পতনের একটি অংশ।
তারপরও ফান্ডটির পুরো সম্পদ হারিয়ে যায়নি, যা শিরোনাম তৈরির সময় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফান্ডটি ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৪৫ হাজার ৫৫৫ টাকা নিট মুনাফা করেছে; প্রতি ইউনিট আয় ছিল ৪৯ পয়সা। তবে ট্রাস্টি ওই বছরের জন্য কোনো নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি। ৩০ জুন বাজারমূল্যভিত্তিক NAV ছিল প্রতি ইউনিটে ১০ টাকা।
সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হিসাবে ফান্ডটির বাজারমূল্যভিত্তিক মোট নিট সম্পদ ছিল প্রায় ৯৯ কোটি ২০ লাখ টাকা, বা প্রতি ইউনিটে ৯ টাকা ৯২ পয়সা। ক্রয়মূল্যভিত্তিক নিট সম্পদ ছিল প্রায় ১১৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা, বা প্রতি ইউনিটে ১১ টাকা ৭১ পয়সা। অর্থাৎ নিরীক্ষকের উদ্বেগ গুরুতর হলেও “ফান্ডের সম্পদ শূন্য” এমন কোনো চিত্র নেই। মূল প্রশ্ন দুটি নির্দিষ্ট জায়গায়: এক্সিম ব্যাংকের আমানত কত দ্রুত ও কোন কাঠামোয় উদ্ধার হবে এবং রেজল্যুশনের পর গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারের ক্ষতি স্থায়ীভাবে কতটুকু দাঁড়াবে।
এসইএমএল আইবিবিএল শরিয়াহ ফান্ডের এই পরিস্থিতি বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের দীর্ঘদিনের আর্থিক অবনতি ও পরিচালনাগত সমস্যার পর সেগুলোকে রেজল্যুশনের আওতায় এনে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত করেছে। আগস্টের শেষ সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, নতুন ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে এবং আগের অনিয়ম ও সম্পদ সরানোর অভিযোগ নিয়ে ফরেনসিক অডিটও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে ফান্ডটির ঝুঁকির পেছনে মূলত বৃহত্তর ব্যাংক রেজল্যুশন সংকটই কাজ করছে।
সম্পাদনা নোট: আগের প্রতিবেদনে “মোট বিনিয়োগ ৬৪ কোটি ৯৯ লাখ ১৪৫ টাকা” বলা হয়েছিল। নিরীক্ষকের প্রকাশিত নথিতে সংশ্লিষ্ট fair-value investment-এর অঙ্ক ৬৪ কোটি ৯ লাখ ৯০ হাজার ১৪৫ টাকা (Tk 640,990,145)। আর ৩০ জুনের পোর্টফোলিও স্টেটমেন্টে মূলধনবাজারের সিকিউরিটিজের বাজারমূল্য প্রায় ৬৪ কোটি ৭ লাখ টাকা। কাজেই ৬৪ কোটি ৯৯ লাখের অঙ্কটি ব্যবহার না করাই সঠিক।

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























