বিশ্ববাজারের তীব্র প্রতিযোগিতা, জ্বালানি সংকট ও পরিবেশগত বাধ্যবাধকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের শিল্প মালিকদের সামনে সৌরবিদ্যুৎ এখন আর বিকল্প নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক সমাধান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ২০৩০ সালের ডিকার্বনাইজেশন লক্ষ্য অর্জনে পোশাক খাতের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তবে সম্ভাবনা সত্ত্বেও অর্থায়ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় ধীরগতিতে এগোচ্ছে শিল্পে সোলার স্থাপন।
প্রতিযোগীদের তুলনায় ব্যাকফুটে বাংলাদেশ
বিশ্ববাজারে রপ্তানির পাল্লায় টিকে থাকতে বিশ্বজুড়ে গ্রিন এনার্জির ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে। অনুসন্ধানে জানা যায়, পাকিস্তানে মোট ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৫৬ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম ও চীনে ৩৫ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অথচ বাংলাদেশে এই হার মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি।
ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টার (আইজিসি)-এর অর্থায়নে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির একটি যৌথ গবেষণায় (অক্টোবর ২০২৫) দেখা গেছে, গাজীপুর ও সাভারের ৬৬১টি কারখানার মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ কারখানা রূফটপ সোলারসহ নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাকি ৬৯ শতাংশ কারখানা এখনো এর আওতায় আসেনি। মূলত উচ্চ প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণেই উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ছেন।
উৎপাদন খরচ অর্ধেকের নিচে নামায় সোলার
বর্তমানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দিনের বেলা প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম পড়ে ১১.৪৭ থেকে ১১.৫৭ টাকা। সেখানে নিজস্ব ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রতি ইউনিটে খরচ হয় মাত্র ৫ থেকে ৭ টাকা। ফলে সৌরবিদ্যুৎ কারখানাগুলোর সার্বিক পরিচালনা ব্যয় ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) তথ্যমতে, শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের মোট সক্ষমতা ইতোমধ্যে ১,০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে এবং পাইপলাইনে রয়েছে আরও ৫০০ মেগাওয়াট। তবে মোট সক্ষমতার বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র ১৭-১৮টি বড় শিল্পগ্রুপ। এর মধ্যে রয়েছে, আকিজ গ্রুপ ৬৭ মেগাওয়াট, মেঘনা গ্রুপ ৪২ মেগাওয়াট, প্রাণ-আরএফএল ৩০ মেগাওয়াট, হাবিব গ্রুপ ২৯ মেগাওয়াট, ওয়ালটন ১৮ মেগাওয়াট, তমিজউদ্দিন টেক্সটাইল ১০ মেগাওয়াট, বিআরবি কেবলস ৮.৪ মেগাওয়াট এবং ডিবিএল ৭ মেগাওয়াট।
বিনিয়োগ ও নীতিগত জটিলতায় আটকে সম্ভাবনা
বাংলাদেশ নিট তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, ব্যাংকগুলোতে গ্রিন ফান্ড থাকলেও তা সহজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থায়নের অনুমোদন পেতেই অন্তত ৬ মাস সময় লেগে যায়। এই সময়টায় উদ্যোক্তাদের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। এছাড়া লিড সার্টিফাইড কারখানার জন্য কর ছাড়ের নিয়ম থাকলেও জটিলতায় বাস্তবে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর দিতে হচ্ছে।
নীতিগত জায়গায় ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (BNBC) সংশোধনে বিলম্ব এবং স্পষ্ট ‘ফায়ার কোড’ না থাকায় ছাদে প্যানেল স্থাপনে নিরাপত্তা জটিলতা থেকেই যাচ্ছে। পাশাপাশি ডাইংয়ের মতো ভারী বয়লার বিদ্যুতে চালানো সম্ভব নয় বলে চীনের মতো ‘সেন্ট্রাল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ থেকে স্টিম সরবরাহের টেকসই পরিকল্পনার দাবিও উঠেছে।
উত্তরণের পথ ও আগামী দিনের পথরেখা
জমি স্বল্পতার কারণে বাংলাদেশে ‘রূফটপ সোলার’-ই প্রধান ভরসা। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) ইতোমধ্যে শিল্পে বড় অর্থায়ন চালিয়েছে। বড় কারখানাগুলো নেট মিটারিং সুবিধা নিলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) কারখানার আর্থিক সীমাবদ্ধতা দূর করতে ‘ওপেক্স’ বা ‘রেসকো’ (RESCO) মডেল বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, পোশাক ও শিল্প খাতে গ্রিন এনার্জি বা ডিকার্বনাইজেশন এখন কেবল পছন্দের বিষয় নয়—এটি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর, ব্যবসার স্থায়িত্ব ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মূল শর্ত। নীতিগত সহজীকরণ ও দ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই সম্ভাবনা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























