১২:৫৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চার বছরের মূল্যস্ফীতি: বাজারদর ছাড়িয়ে জীবনযাত্রার সংকট

The gallery was not found!

চার বছর ধরে নিত্যপণ্যের চড়া বাজারে চাপের মধ্যে আছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় আরও বেড়েছে। তবে অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে খরচ যতটা বাড়ছে, খুচরা দাম বাড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। বিপরীতে মানুষের আয় বাড়ছে না একই হারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বাজারদরের সমস্যা নয়, জীবনযাত্রা ও সামগ্রিক অর্থনীতির সংকটে রূপ নিয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ইতিমধ্যে পরিবহন ও পণ্যের দামে পড়েছে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে প্রায় ৪০ মণ মাছ ঢাকায় আনতে ব্যবসায়ী আলী হোসেনের ট্রাকভাড়া বেড়েছে প্রায় দুই হাজার টাকা। এতে কেজিপ্রতি পরিবহন ব্যয় বেড়েছে দেড় টাকারও কম। অথচ রাজধানীর বাজারে চাষের মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থাৎ উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা বাজারের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম যোগ হয়ে শেষ চাপটি পড়ছে ভোক্তার ওপর।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বড় চাপ শুরু হয় ২০২২ সালে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামালের দাম বাড়ে। একই সময়ে টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।

আমিষের তুলনামূলক সস্তা উৎস ডিম ও মুরগির দামও বেড়েছে। রাজধানীতে ডজনপ্রতি ডিম প্রায় ১৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় আমিষ ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে।

অন্যদিকে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় পেঁয়াজ কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা এবং আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে।

জীবনযাত্রার চাপ সবচেয়ে স্পষ্ট আয় ও খাবারের ব্যয়ে। বর্তমান বাজারদর ধরে ঢাকার চার সদস্যের একটি পরিবারের শুধু খাবারেই মাসে প্রায় ২৬ হাজার ৮৮৪ টাকা প্রয়োজন। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ যোগ হয়নি। অথচ তৈরি পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনমতো শুল্ক সমন্বয় বা সীমিত আমদানি, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থায় অস্বাভাবিক মুনাফা ঠেকাতে হবে। চার বছরের মূল্যস্ফীতি বহু পরিবারের সঞ্চয় কমিয়েছে, খাদ্যাভ্যাস বদলেছে এবং ঋণনির্ভরতা বাড়িয়েছে। নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে এই চাপ আরও গভীর হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

জলবায়ু ঝুঁকির দেশগুলোর জন্য সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

Business Times24

চার বছরের মূল্যস্ফীতি: বাজারদর ছাড়িয়ে জীবনযাত্রার সংকট

Update Time : ১২:১৩:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চার বছর ধরে নিত্যপণ্যের চড়া বাজারে চাপের মধ্যে আছে সাধারণ মানুষ। এর মধ্যে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় আরও বেড়েছে। তবে অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে খরচ যতটা বাড়ছে, খুচরা দাম বাড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। বিপরীতে মানুষের আয় বাড়ছে না একই হারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এখন শুধু বাজারদরের সমস্যা নয়, জীবনযাত্রা ও সামগ্রিক অর্থনীতির সংকটে রূপ নিয়েছে।

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ইতিমধ্যে পরিবহন ও পণ্যের দামে পড়েছে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে প্রায় ৪০ মণ মাছ ঢাকায় আনতে ব্যবসায়ী আলী হোসেনের ট্রাকভাড়া বেড়েছে প্রায় দুই হাজার টাকা। এতে কেজিপ্রতি পরিবহন ব্যয় বেড়েছে দেড় টাকারও কম। অথচ রাজধানীর বাজারে চাষের মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অর্থাৎ উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা বাজারের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি দাম যোগ হয়ে শেষ চাপটি পড়ছে ভোক্তার ওপর।

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বড় চাপ শুরু হয় ২০২২ সালে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও কাঁচামালের দাম বাড়ে। একই সময়ে টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।

আমিষের তুলনামূলক সস্তা উৎস ডিম ও মুরগির দামও বেড়েছে। রাজধানীতে ডজনপ্রতি ডিম প্রায় ১৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারের খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় আমিষ ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে।

অন্যদিকে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় পেঁয়াজ কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা এবং আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এতে বোঝা যায়, উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমে।

জীবনযাত্রার চাপ সবচেয়ে স্পষ্ট আয় ও খাবারের ব্যয়ে। বর্তমান বাজারদর ধরে ঢাকার চার সদস্যের একটি পরিবারের শুধু খাবারেই মাসে প্রায় ২৬ হাজার ৮৮৪ টাকা প্রয়োজন। এর সঙ্গে বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ যোগ হয়নি। অথচ তৈরি পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সুদের হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানো, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনমতো শুল্ক সমন্বয় বা সীমিত আমদানি, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং সরবরাহব্যবস্থায় অস্বাভাবিক মুনাফা ঠেকাতে হবে। চার বছরের মূল্যস্ফীতি বহু পরিবারের সঞ্চয় কমিয়েছে, খাদ্যাভ্যাস বদলেছে এবং ঋণনির্ভরতা বাড়িয়েছে। নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে এই চাপ আরও গভীর হবে।