১২:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংক: প্রতি উপজেলায় ১০ তরুণ পাবেন ঋণ, লক্ষ্য ৫,০৩০ উদ্যোক্তা

The gallery was not found!

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যবসার স্বপ্ন দেখেন—কিন্তু পুঁজি নেই। আইডিয়া আছে, বাজারের সম্ভাবনাও আছে; আটকে যায় অর্থের অভাবে। এবার এমন তরুণদের খুঁজে বের করে ব্যবসার শুরুতেই পাশে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্য শুধু ঋণ দেওয়া নয়, বরং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাকে খুঁজে এনে দাঁড় করানো।

এই উদ্যোগে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১০ জন করে মোট ৫ হাজার ৩০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য গঠন করা হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল। উদ্যোক্তাভেদে দেওয়া হবে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা। অর্থায়নে থাকবে কম সুদের ঋণের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষ অনুদান।

ঋণ ৪–৭ শতাংশ সুদে, অনুদান ফেরত দিতে হবে না

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উদ্যোক্তার ব্যবসার ধরন বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হবে। সুদের হার হবে ৪ থেকে ৭ শতাংশ। পাশাপাশি ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে দেওয়া হবে অনুদান।

তবে অনুদানের সঙ্গে রয়েছে শর্ত। অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করলে সেই টাকা আর ফেরত দিতে হবে না। কিন্তু অর্থের অপব্যবহার হলে অনুদানটি ঋণে পরিণত হবে।

শুরুতে অনুদানের একটি অংশ দেওয়া হবে। বাকি অর্থ আলাদা হিসাবে রাখা হবে। উদ্যোক্তার ব্যবসার অগ্রগতি, ঋণ পরিশোধের আগ্রহ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ মিলবে। অর্থাৎ শুরুতেই পুরো টাকা হাতে তুলে দেওয়ার বদলে ধাপে ধাপে সহায়তার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আগে ৮ জেলা, পরে সারা দেশে

প্রথম ধাপে দেশের ৮ বিভাগের ৮ জেলায় কর্মসূচিটি শুরু হবে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সাফল্য এলে তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে দেশের সব জেলা ও উপজেলায়।

প্রতিটি জেলায় একটি ব্যাংক অর্থায়নের দায়িত্ব পালন করবে। তবে উদ্যোক্তা বাছাইয়ে এককভাবে ব্যাংকের হাতে ক্ষমতা থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হবে।

এরপর উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক ধারণা, সম্ভাবনা, সক্ষমতা এবং প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন মূল্যায়ন করে অর্থায়ন করা হবে।

লক্ষ্য পুঁজি নয়, টেকসই উদ্যোক্তা

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩০ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক তরুণের ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও প্রাথমিক পুঁজি, পরামর্শ, নেটওয়ার্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের অভাবে তাঁরা এগোতে পারেন না। ফলে সম্ভাবনাময় অনেক উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এমন উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে অর্থায়নের পাশাপাশি তাঁদের বিকাশেও ভূমিকা রাখতে চায় এই কর্মসূচি। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ সফলভাবে গড়ে উঠতে পারলেও তা কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

৫০০ কোটি টাকার তহবিল, অর্ধেক দেবে ব্যাংকগুলো

৫ হাজার ৩০ জন উদ্যোক্তার জন্য অনুমোদিত ৫০০ কোটি টাকার তহবিলে বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে ২৫০ কোটি টাকা। বাকি ২৫০ কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলো থেকে। তহবিলের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর সিএসআর কর্মসূচি থেকেও আসবে।

উদ্যোক্তা খোঁজা, প্রচার, আবেদন যাচাই, সভা- কর্মশালা, ব্যবসায়িক ধারণার মূল্যায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো কাজেও অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বাস্তবায়ন ব্যয় বহন করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই তহবিল থেকে।

সাফল্যের চাবিকাঠি বাছাই ও প্রশিক্ষণে

উদ্যোক্তা অর্থায়নবিষয়ক পরামর্শক শওকত হোসেনের মতে, উদ্যোগটি ভালো হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে উদ্যোক্তা অর্থায়নের কিছু কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাদারভাবে উদ্যোক্তা নির্বাচন জরুরি।

একইভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান মনে করেন, উদ্যোক্তা বাছাই পেশাদারভাবে করতে হবে। অর্থ দেওয়ার আগে প্রশিক্ষণ এবং অনুদান ধাপে ধাপে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে উদ্যোগটি বড় ফল দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্ন শুধু ৫০০ কোটি টাকা কোথায় যাবে—তা নয়; প্রশ্ন হলো, এই অর্থ থেকে কতজন সত্যিকারের উদ্যোক্তা তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কর্মসূচির সাফল্য মাপতে হবে সেই হিসাবেই।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

জলবায়ু ঝুঁকির দেশগুলোর জন্য সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

Business Times24

বাংলাদেশ ব্যাংক: প্রতি উপজেলায় ১০ তরুণ পাবেন ঋণ, লক্ষ্য ৫,০৩০ উদ্যোক্তা

Update Time : ১০:৫২:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যবসার স্বপ্ন দেখেন—কিন্তু পুঁজি নেই। আইডিয়া আছে, বাজারের সম্ভাবনাও আছে; আটকে যায় অর্থের অভাবে। এবার এমন তরুণদের খুঁজে বের করে ব্যবসার শুরুতেই পাশে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। লক্ষ্য শুধু ঋণ দেওয়া নয়, বরং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাকে খুঁজে এনে দাঁড় করানো।

এই উদ্যোগে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১০ জন করে মোট ৫ হাজার ৩০ জন তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য গঠন করা হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল। উদ্যোক্তাভেদে দেওয়া হবে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা। অর্থায়নে থাকবে কম সুদের ঋণের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষ অনুদান।

ঋণ ৪–৭ শতাংশ সুদে, অনুদান ফেরত দিতে হবে না

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উদ্যোক্তার ব্যবসার ধরন বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হবে। সুদের হার হবে ৪ থেকে ৭ শতাংশ। পাশাপাশি ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে দেওয়া হবে অনুদান।

তবে অনুদানের সঙ্গে রয়েছে শর্ত। অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করলে সেই টাকা আর ফেরত দিতে হবে না। কিন্তু অর্থের অপব্যবহার হলে অনুদানটি ঋণে পরিণত হবে।

শুরুতে অনুদানের একটি অংশ দেওয়া হবে। বাকি অর্থ আলাদা হিসাবে রাখা হবে। উদ্যোক্তার ব্যবসার অগ্রগতি, ঋণ পরিশোধের আগ্রহ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ মিলবে। অর্থাৎ শুরুতেই পুরো টাকা হাতে তুলে দেওয়ার বদলে ধাপে ধাপে সহায়তার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আগে ৮ জেলা, পরে সারা দেশে

প্রথম ধাপে দেশের ৮ বিভাগের ৮ জেলায় কর্মসূচিটি শুরু হবে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সাফল্য এলে তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে দেশের সব জেলা ও উপজেলায়।

প্রতিটি জেলায় একটি ব্যাংক অর্থায়নের দায়িত্ব পালন করবে। তবে উদ্যোক্তা বাছাইয়ে এককভাবে ব্যাংকের হাতে ক্ষমতা থাকবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হবে।

এরপর উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক ধারণা, সম্ভাবনা, সক্ষমতা এবং প্রকৃত অর্থের প্রয়োজন মূল্যায়ন করে অর্থায়ন করা হবে।

লক্ষ্য পুঁজি নয়, টেকসই উদ্যোক্তা

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩০ আগস্টের সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক তরুণের ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও প্রাথমিক পুঁজি, পরামর্শ, নেটওয়ার্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের অভাবে তাঁরা এগোতে পারেন না। ফলে সম্ভাবনাময় অনেক উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যায়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এমন উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে অর্থায়নের পাশাপাশি তাঁদের বিকাশেও ভূমিকা রাখতে চায় এই কর্মসূচি। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ সফলভাবে গড়ে উঠতে পারলেও তা কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

৫০০ কোটি টাকার তহবিল, অর্ধেক দেবে ব্যাংকগুলো

৫ হাজার ৩০ জন উদ্যোক্তার জন্য অনুমোদিত ৫০০ কোটি টাকার তহবিলে বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে ২৫০ কোটি টাকা। বাকি ২৫০ কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলো থেকে। তহবিলের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর সিএসআর কর্মসূচি থেকেও আসবে।

উদ্যোক্তা খোঁজা, প্রচার, আবেদন যাচাই, সভা- কর্মশালা, ব্যবসায়িক ধারণার মূল্যায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো কাজেও অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বাস্তবায়ন ব্যয় বহন করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই তহবিল থেকে।

সাফল্যের চাবিকাঠি বাছাই ও প্রশিক্ষণে

উদ্যোক্তা অর্থায়নবিষয়ক পরামর্শক শওকত হোসেনের মতে, উদ্যোগটি ভালো হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে উদ্যোক্তা অর্থায়নের কিছু কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাদারভাবে উদ্যোক্তা নির্বাচন জরুরি।

একইভাবে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান মনে করেন, উদ্যোক্তা বাছাই পেশাদারভাবে করতে হবে। অর্থ দেওয়ার আগে প্রশিক্ষণ এবং অনুদান ধাপে ধাপে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে উদ্যোগটি বড় ফল দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্ন শুধু ৫০০ কোটি টাকা কোথায় যাবে—তা নয়; প্রশ্ন হলো, এই অর্থ থেকে কতজন সত্যিকারের উদ্যোক্তা তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন কর্মসূচির সাফল্য মাপতে হবে সেই হিসাবেই।