ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান প্রত্যাশিত ফল না আনায় এবার অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রবাহ বন্ধ করাই ওয়াশিংটনের নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য। তবে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা, বিকল্প বাণিজ্যপথ এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান এই পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ ঘোষণা করেছেন। এই অভিযানের লক্ষ্য ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলা এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক লেনদেন ও আয়-প্রবাহ সীমিত করা।
বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে না। বিশেষ করে ইরানের তেল বাণিজ্যে সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ওয়াশিংটন।
নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল ও সামুদ্রিক পরিবহন—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে লক্ষ্য করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ৬০টির বেশি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজও নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এসেছে। ইরানের পক্ষে অর্থপাচারে সহায়তাকারীদের ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটনকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নিজ দেশের জনমতের পরিবর্তনও। রয়টার্স/ইপসোসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। মার্চে এই হার ছিল ৩৭ শতাংশ এবং চলতি মাসের শুরুতে ছিল ৩৪ শতাংশ।
যুদ্ধের প্রতি রিপাবলিকানদের সমর্থনও কমেছে। মার্চে রিপাবলিকানদের মধ্যে সামরিক অভিযানের সমর্থন ছিল ৭৭ শতাংশ, যা বর্তমানে ৬৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই জরিপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মক্ষমতার অনুমোদনও ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। আবার ৮৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, যুদ্ধ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। ফলে ইরান নীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও সামলাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, প্রায় পাঁচ দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় নিজস্ব কৌশল গড়ে তুলেছে। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি অর্থনীতিকে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য, তেল, শিল্প, কৃষি, ব্যাংকিং ও কূটনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা ও সহকারী মোহাম্মদ মোখবেরও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপসহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ মোকাবিলায় তেহরান একটি ‘প্রতিরোধ পরিকল্পনা’ প্রস্তুত করেছে।
ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি এই জলপথ পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থনৈতিক চাপ ও সামুদ্রিক অবরোধ আরও বাড়লে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান কঠোর অবস্থান নিতে পারে বলে দেশটির কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি চালু রাখতে ইরান ছায়া নৌবহর, স্থলপথ এবং বিকল্প পরিবহন রুট ব্যবহারের চেষ্টা করছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান। ইরাকি জাহাজকে বিশেষ অনুমতি দেওয়া এবং নৌপথ নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতার মতো পদক্ষেপকে এই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তেল রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা বা তার পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতায় ইরান বিকল্প বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক অংশীদার, বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেশটির ওপর চাপ বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ফল অর্জন কতটা সম্ভব হবে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান একদিকে তেহরানের অর্থনীতির জন্য বড় পরীক্ষা, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞানির্ভর কৌশলেরও কঠিন পরীক্ষা। আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে ইরান কতটা চাপ সামলাতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখতে পারে—তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিণতি।
সামরিক সংঘাত থেকে অর্থনৈতিক চাপের দিকে যুদ্ধের কেন্দ্র সরে গেলেও মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক ‘শ্বাসরোধ’ কি সত্যিই ইরানকে নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করতে পারবে, নাকি দীর্ঘদিনের প্রতিরোধ কৌশল অনুসরণ করে তেহরান আবারও চাপ সামলে উঠবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক 




























