জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকরা জীবন বাজি রেখে যে বীরত্ব ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষু ও বুলেটের ভীতি উপেক্ষা করে স্ট্রেচার, ব্যান্ডেজ আর অস্ত্রোপচারের যন্ত্র হাতে চিকিৎসকরা যেভাবে নিভৃতচারী যোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছেন, তা একটি নতুন ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
আজ সোমবার (২৭ জুলাই, ২০২৬) জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: স্বাস্থ্য সেক্টরের অবদান ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)-এর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ শাখা যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মূল প্রবন্ধ ও শহীদদের পরিসংখ্যান
সেমিনারে ‘জুলাইয়ের নিভৃতচারী বীর চিকিৎসকরা: ইনসাফের বাংলাদেশ কায়েমে পেশাগত ও মানবিক দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিউরো সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সুজন শরীফ।
মূল প্রবন্ধে জাতিসংঘের মানবধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের (OHCHR) তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদনের বরাতে জানানো হয়:
-
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এ পর্যন্ত অন্তত ১,৪০০ জন বীর সন্তান প্রাণ হারিয়েছেন।
-
আহত হয়েছেন ১৪,০০০-এরও বেশি মানুষ।
-
অন্তত ৪৫০ জন এক চোখ হারিয়েছেন এবং ২০ জনেরও বেশি চিরতরে অন্ধত্ব বরণ করেছেন।
প্রবন্ধে বলা হয়, চব্বিশের রক্তঝরা জুলাইয়ে বুলেট ও বারুদের আতঙ্কের মধ্যেও প্রতিটি হাসপাতাল ও অপারেশন থিয়েটার পরিণত হয়েছিল এক একটি নিরাপদ দুর্গে। আহতদের রক্ষা করতে চিকিৎসকরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইমার্জেন্সি রুম ও অপারেশন থিয়েটারে দিন-রাত এক করে সেবা দিয়েছেন।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ও মূল দাবি
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এনডিএফ-এর সহ-সভাপতি ডা. মো: আতিয়ার রহমান।
সেমিনারে বক্তারা স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠন ও শহীদ-আহতদের সম্মানে ৬টি মূল দাবি তুলে ধরেন: ১. শহীদ ও আহত চিকিৎসকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: গণঅভ্যুত্থানে শহীদ চিকিৎসক, চিকিৎসা কর্মী ও সাধারণ নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় গেজেটে যথাযথ মর্যাদা ও খেতাব প্রদান। ২. বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: আহতদের জন্য আজীবন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসা (প্রয়োজনে বিদেশে প্রেরণ) এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। ৩. শহীদ পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ: শহীদদের সন্তান ও পরিবারের জীবন ধারণ, শিক্ষা এবং সুরক্ষার সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ। ৪. বিচার নিশ্চিতকরণ: জুলাই গণহত্যার মূল পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির সাথে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। ৫. স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার: চিকিৎসক সমাজের নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা এবং স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা। ৬. পেশাগত ও মানবিক মর্যাদা: পেশাগত দায়বদ্ধতার পাশাপাশি চিকিৎসা সেবাকে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করা।
উপস্থিত অতিথি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন:
-
ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি (সেক্রেটারি, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ)
-
ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ এমপি (যশোর-২)
-
অধ্যাপক ডা. সাজেদ আব্দুল খালেক (সিনিয়র সহ-সভাপতি, এনডিএফ)
-
হাফেজ মো: রাশেদুল ইসলাম এমপি (শেরপুর-১)
-
সাদিক কায়েম (ভিপি, ডাকসু)
-
ডা. এমজি ফারুক হোসেন (সভাপতি, এনডিএফ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)
অনুষ্ঠানে এনডিএফ-এর কেন্দ্র ও বিভিন্ন শাখার শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসক, নিউরোসার্জন, স্বাস্থ্যকর্মী ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রুহের মাগফিরাত ও আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বিশেষ দোয়া মোনাজাত করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক 






















