চলতি বছরের মার্চ থেকে শুরু হয়ে পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে চলছে হাম ও হামের প্রাদুর্ভাব। হামের উপসর্গে নতুন করে আরও তিনজন মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে মারা গেছে ৮১৯ জন। আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯৯ জনের। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৯১৮ জন। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সোমবার সকাল আটটা থেকে আজ সকাল আটটা পর্যন্ত সময়ে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া নিয়মিত এই পরিসংখ্যানে বয়সভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায় না। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, হাম সব বয়সী মানুষের হতে পারে, তবে শিশুরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আজকের প্রতিবেদন বলছে, দেশে আরও ১ হাজার ২ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দেওয়া রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮০।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সবশেষ নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্তের সংখ্যা ৫৯। আর এ পর্যন্ত ১৭ হাজার ৯৮৯ রোগীর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ২৮৯ রোগী। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৮০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, নতুন করে নিশ্চিত হামে কেউ মারা যায়নি। হামের উপসর্গে যে তিনজন মারা গেছে, তাদের একজন ঢাকা বিভাগের, অপর দুজন সিলেট বিভাগের।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নতুন করে পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
দেশের যেসব এলাকায় হাম-রুবেলার টিকা থেকে কিছু শিশু বাদ পড়েছে, সেসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য মজুত থাকা ১৬ লাখ টিকা ব্যবহার করা হবে।
গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টিকাবিষয়ক আন্তসংস্থা সমন্বয় কমিটির (আইসিসি) সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী যেসব শিশু কিছু বিচ্ছিন্ন এলাকায় টিকা পায়নি, তাদের সবাইকে টিকার আওতায় আনা হবে।
আক্রান্তদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা নাজুক। সভায় জানানো হয়, হামে আক্রান্তদের ১০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম, ৭৪ শতাংশের বয়স ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে, ১৪ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে দশ বছর এবং বাকি ২ শতাংশের বয়স দশ বছরের বেশি। অর্থাৎ আক্রান্তদের পরিপ্রেক্ষিতে শিশুরাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে।
এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জাতীয় ক্যাম্পেইনে ব্যাপক টিকা দেওয়া হলেও প্রাদুর্ভাব পুরোপুরি থামানো যায়নি। ৫ এপ্রিল থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১ কোটি ৯৩ লাখেরও বেশি শিশুকে হামের এক ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। তারপরও সিলেট বিভাগের মতো এলাকায় টিকাদান শুরুর পর থেকে মৃত্যু ও সংক্রমণের সংখ্যা আগের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হওয়ার কথা হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইন। কিন্তু বারবার পিছিয়ে শেষমেশ ২০২৬ সালের এপ্রিলে শুরু হয়, সাত মাস দেরিতে। এর মধ্যে সর্বনাশ যা হবার তা হয়েই গেছে!
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লিখিতভাবে স্বীকার করেছে, টাইফয়েডের টিকাদান কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণেই হামের ক্যাম্পেইন পিছিয়ে পড়েছিল। এর পাশাপাশি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিয়মিত কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনের তুলনায় হাম-রুবেলার টিকা ৪২ শতাংশ কম কেনা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের গত জুনের সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হামের কোনো টিকা পায়নি। বিশেষজ্ঞরা আরও জানাচ্ছেন, ২০২৪ সাল থেকে ভিটামিন-এ বিতরণের তিনটি ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় শিশুদের অপুষ্টি ও ভিটামিন-এ-র ঘাটতি হামের এই মৃত্যুহার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসের এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যেতে পারে বলে আইসিডিডিআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে। অর্থাৎ টিকার কার্যকারিতা নিয়ে নয়, সমস্যাটা টিকা না পাওয়া নিয়েই।
আইসিসির সভায় আগামী বছর যাতে টিকার সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাঠপর্যায়ে টিকাদান আরও শক্তিশালী করতে শূন্য পদে জনবল নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক 

























