বাংলাদেশের কৃষি খাতে শ্রম উৎপাদনশীলতায় বড় ধরনের আঞ্চলিক বৈষম্য দেখা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ধান, গম ও মৌসুমি শাকসবজির মতো সাময়িক শস্য উৎপাদনে রাজধানী ঢাকার তুলনায় দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা প্রায় তিনগুণ বেশি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাময়িক শস্য উৎপাদনে প্রতি শ্রমদিবসে জাতীয় গড় উৎপাদনশীলতা ২ হাজার ৬৬৪ টাকা। তবে ভৌগোলিক অবস্থান, মাটির গুণাগুণ এবং নগরায়ণের প্রভাবে অঞ্চলভেদে এই হিসাবে বড় ধরনের ফারাক তৈরি হয়েছে।
শীর্ষে রংপুর, মজবুত অবস্থান উত্তরাঞ্চলের
কৃষি শ্রমের উৎপাদনশীলতায় সবাইকে ছাড়িয়ে শীর্ষে রয়েছে রংপুর বিভাগ। সেখানে প্রতি শ্রমদিবসে উৎপাদনশীলতার মান দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯৩ টাকা, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উর্বর মাটি, উচ্চফলনশীল বীজের সঠিক ব্যবহার এবং বছরের বিভিন্ন সময়ে শ্রমের দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই রংপুরে এই সফলতা এসেছে।
রংপুরের পাশাপাশি দেশের আরও তিনটি বিভাগ জাতীয় গড়ের চেয়ে ভালো অবস্থানে থেকে কৃষির মূল শক্তির পরিচয় দিয়েছে ময়মনসিংহ ৩,২৭৩ টাকা, খুলনা ৩,০১৫ টাকা, রাজশাহী ২,৯২১ টাকা।
কেন তলানিতে ঢাকা ও উপকূলীয় অঞ্চল?
চিত্রের ঠিক উল্টো রূপ দেখা গেছে ঢাকা বিভাগে। এখানে প্রতি শ্রমদিবসে উৎপাদনশীলতা মাত্র ১ হাজার ৪৭৩ টাকা, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ কম। দ্রুত নগরায়ণ, কৃষিজমি টুকরো হয়ে যাওয়া এবং উপশহরগুলোতে কৃষি উপকরণ ও বাড়তি মজুরির শ্রমিক খরচের কারণে এই অঞ্চলে কৃষির আয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত নানা চ্যালেঞ্জের কারণে পিছিয়ে রয়েছে উপকূলীয় ও পূর্বাঞ্চলীয় বিভাগগুলোও। চট্টগ্রাম ২,৫২১ টাকা, বরিশাল ২,২৭১ টাকা, সিলেট ২,১৪৮ টাকা।
শহরের চেয়ে এগিয়ে গ্রামীণ খামার
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শহর বা উপশহরের চেয়ে গ্রামের কৃষকরা শ্রমের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছেন। গ্রামে প্রতি শ্রমদিবসে উৎপাদনশীলতা ২ হাজার ৬৯০ টাকা, যেখানে শহর এলাকায় তা ২ হাজার ৪৭২ টাকা।
কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলামের মতে, গ্রাম ও শহরের এই পার্থক্যের বড় কারণ পারিবারিক শ্রম। তিনি জানান, গ্রামে পরিবারের সবাই কৃষিকাজে হাত লাগাতে পারেন এবং সেখানে পর্যাপ্ত আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। অন্যদিকে, শহরে জমি কম এবং কাজ করার জন্য চড়া দামে দিনমজুরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই বাড়তি খরচের কারণে শহরের কৃষি পিছিয়ে পড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছাতে হবে। বিশেষ করে জলবদ্ধতা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং চাষাবাদে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়িয়ে পুরো দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব।

নিজস্ব প্রতিবেদক 























