স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়া, আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP)-এ সদস্যপদ এবং নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) সম্পাদনে দেশটির সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ।
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্যে সোমবার (১০ আগস্ট) ওয়েলিংটনে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের (MFAT) সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে এফটিএ উইংয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ওয়েলিংটনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর ইশতিয়াক আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। নিউজিল্যান্ডের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন দেশটির ট্রেড নেগোসিয়েশনস অ্যান্ড পলিসি ডিভিশনের ডিভিশনাল ম্যানেজার সারা মেম্যান্ড ও ইউনিট ম্যানেজার জোনাস হোল্যান্ড।
RCEP সদস্যপদে সংস্কারের অগ্রগতি
বৈঠকে বাংলাদেশ জানায়, RCEP-এর সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশ্নাবলীর বিস্তারিত জবাব ইতোমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জোটটির উচ্চমানের বাণিজ্য কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এসব সংস্কারের মধ্যে রয়েছে শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো, টেলিযোগাযোগ, আর্থিক সেবা ও লজিস্টিকস খাত আরও উন্মুক্ত করা এবং প্রতিযোগিতা, পেটেন্ট, কপিরাইট ও ডেটা সুরক্ষায় আধুনিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন।
RCEP-এর অন্যতম সদস্য নিউজিল্যান্ডের কাছে সংবেদনশীল পণ্য ও শিল্প খাত সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পর্যায়ক্রমিক শুল্ক নমনীয়তার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও তুলে ধরে বাংলাদেশ।
এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময়ের যুক্তি
এলডিসি উত্তরণে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে বলে জানানো হয়।
এর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আর্থ-সামাজিক রূপান্তর এবং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও আলোচনায় তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখতে বিভিন্ন অংশীদার দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে। এরই অংশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী নিউজিল্যান্ড
এর আগে মে মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠকে নিউজিল্যান্ডের নন-রেসিডেন্ট হাইকমিশনার ডেভিড পাইন এলডিসি উত্তরণের পরও বাংলাদেশের পণ্যে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। একই বৈঠকে দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ এফটিএর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করে।
বাংলাদেশের জন্য নিউজিল্যান্ডের বাজারে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার বাজার সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের জন্য বাংলাদেশে কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্য, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে শুধু বিদ্যমান বাজারসুবিধা নয়, নতুন বাণিজ্য চুক্তি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। RCEP বর্তমানে ১৫টি এশিয়া-প্যাসিফিক দেশের সমন্বয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে বিবেচিত।

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























