০৫:৫১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সনদের মোহে নিঃস্ব অভিভাবক: শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ ট্র্যাজেডি ।

The gallery was not found!

‘ছেলে আমার মাস্টার্স পাস!’ — একসময় এই একটি বাক্যই পাড়া-মহল্লা বা পরিবারে চরম সম্মান ও গর্বের প্রতীক ছিল। কিন্তু যুগের চাকা দ্রুত ঘুরলেও আমাদের সমাজ ও মানসিকতা আজও আটকে আছে সেই পুরোনো চোরাবালিতেই। আর এই ‘সনদের মোহ’ আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ অভিভাবকের বুকফাটা কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষার এক টুকরো কাগজের ডিগ্রির পেছনে অন্ধের মতো ছুটতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েরা, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন বাবারা।

যে সোনালি বয়সে একটি তরুণের নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের হাল ধরার কথা, ঠিক সেই বয়সে সে চার দেওয়ালে বন্দি থেকে বেকার বসে থাকে একটি সনদের আশায়। অন্যদিকে, সন্তানের একটু ভালো ভবিষ্যতের মরিয়া আশায় অভিভাবকরা বিক্রি করে দিচ্ছেন জীবনের শেষ সম্বলটুকু।

যৌবনের অমূল্য সময়ের অপচয় ও দীর্ঘশ্বাস:
একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সৃষ্টিশীল ও কর্মক্ষম সময় হলো ২০ থেকে ২৭ বছর বয়স। উন্নত বিশ্বে এই বয়সেই তরুণরা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, নতুন ভাবনায় বিশ্বকে বদলানোর লড়াইয়ে নামে। অথচ আমাদের দেশে এই পুরো সোনালি সময়টাই নিঃশেষ হয়ে যায় কেবল একটি মাস্টার্স ডিগ্রির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে।

বিলম্বিত কর্মজীবন: পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সে পড়াশোনা শেষ করে যখন একজন তরুণ প্রথম চাকরির বাজারে পা রাখে, ততক্ষণে তার বুকের ভেতর জমছে পাহাড়সমান ক্লান্তি।

চরম মানসিক হতাশা: বছরের পর বছর শুধু মুখস্থ বিদ্যা আর পরীক্ষার বৈতরণী পার হয়ে যখন ‘সোনার হরিণ’ চাকরিটি মেলে না, তখন সেই তরুণের দীপ্ত চোখগুলো ম্লান হয়ে যায়। হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যায় তারুণ্যের সমস্ত আলো।

জমিজমা ও সঞ্চয় বিক্রি: শিক্ষাবাণিজ্যের নিষ্ঠুর থাবা:
উচ্চশিক্ষার এই তীব্র কৃত্রিম চাহিদাকে পুঁজি করে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে শিক্ষার এক ভয়ংকর বাণিজ্য সাম্রাজ্য। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমিত আসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বাধ্য হয়েই অভিভাবকরা ঝুঁকছেন ব্যয়বহুল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা নানা চটকদার প্রতিষ্ঠানের দিকে।

একটি তথাকথিত ডিগ্রির পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক বাবা-মা আজ নিঃস্ব: তিলে তিলে গড়া জীবনের কষ্টার্জিত জমানো সঞ্চয় এক নিমেষে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পৈতৃক ভিটেমাটি ও আদরের জমিটুকুও জলের দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে চিরতরে আটকা পড়ছেন ঋণের জালে।

বাস্তবতার নির্মম সত্য: জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে সন্তানকে যে ডিগ্রি কিনে দেওয়া হচ্ছে, দিনশেষে তা দিয়ে একটি সাধারণ চাকরির নিশ্চয়তাও মিলছে না। ডিগ্রিধারী বেকারের মিছিলে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি দীর্ঘশ্বাস।

কাগজের সনদ নাকি রক্তমাংসের দক্ষতা?
আজকের পৃথিবী আমূল বদলে গেছে। আধুনিক কর্মবাজার আর কেবল গাণিতিক জিপিএ-৫ বা ঝকঝকে মাস্টার্সের সনদ দেখে কাউকে বুকে টেনে নেয় না; নিয়োগকর্তারা আজ খোঁজেন বাস্তব ‘দক্ষতা’ (Skill)।

ডিগ্রি আছে, কাজ নেই: প্রতিবছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের করলেও কাজের বাজারে তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি, ডিজিটাল বা ব্যবহারিক দক্ষতা থাকছে না।

ভুল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: সমাজে আজও এক অদ্ভুত বৈষম্য গেঁথে আছে—কারিগরি বা হাতে-কলমে কাজকে ছোট করে দেখা হয়। অথচ একজন অদক্ষ সাধারণ গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান বা ফ্রিল্যান্সার আজ অনেক বেশি স্বাবলম্বী।

সংকট থেকে উত্তরণের পথ

অভিভাবকদের এই নিঃস্ব হওয়ার চক্র থেকে বাঁচাতে এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে আমাদের চিন্তাভাবনায় আমূল ও সাহসী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। মাস্টার্স বা বিএ পাস করাই সফলতার একমাত্র ও শেষ মাপকাঠি হতে পারে না—এই সত্যটা অভিভাবকদের মানতে হবে। এসএসসি বা এইচএসসির পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে উৎসাহ দিতে হবে। পাঠ্যক্রমকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

বাবার রক্তপানি করা উপার্জনে কেনা কাগজের ডিগ্রি যদি দিনশেষে বেকারত্বের অভিশাপ আর হতাশা ছাড়া আর কিছু উপহার না দেয়, তবে সেই শিক্ষা অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়। সময় এসেছে সনদের এই অন্ধ মোহ চিরতরে ত্যাগ করার। সন্তানের হাতে কেবল এক টুকরো কাগজ তুলে না দিয়ে, তাদের সত্যিকারের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রতিটি পরিবার ও সমাজের মূল অঙ্গীকার।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর
Business Times24

সনদের মোহে নিঃস্ব অভিভাবক: শিক্ষাব্যবস্থার এক করুণ ট্র্যাজেডি ।

Update Time : ১২:১০:১৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

‘ছেলে আমার মাস্টার্স পাস!’ — একসময় এই একটি বাক্যই পাড়া-মহল্লা বা পরিবারে চরম সম্মান ও গর্বের প্রতীক ছিল। কিন্তু যুগের চাকা দ্রুত ঘুরলেও আমাদের সমাজ ও মানসিকতা আজও আটকে আছে সেই পুরোনো চোরাবালিতেই। আর এই ‘সনদের মোহ’ আজ বাংলাদেশের লাখ লাখ অভিভাবকের বুকফাটা কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চশিক্ষার এক টুকরো কাগজের ডিগ্রির পেছনে অন্ধের মতো ছুটতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়েরা, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন বাবারা।

যে সোনালি বয়সে একটি তরুণের নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পরিবারের হাল ধরার কথা, ঠিক সেই বয়সে সে চার দেওয়ালে বন্দি থেকে বেকার বসে থাকে একটি সনদের আশায়। অন্যদিকে, সন্তানের একটু ভালো ভবিষ্যতের মরিয়া আশায় অভিভাবকরা বিক্রি করে দিচ্ছেন জীবনের শেষ সম্বলটুকু।

যৌবনের অমূল্য সময়ের অপচয় ও দীর্ঘশ্বাস:
একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত, সৃষ্টিশীল ও কর্মক্ষম সময় হলো ২০ থেকে ২৭ বছর বয়স। উন্নত বিশ্বে এই বয়সেই তরুণরা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, নতুন ভাবনায় বিশ্বকে বদলানোর লড়াইয়ে নামে। অথচ আমাদের দেশে এই পুরো সোনালি সময়টাই নিঃশেষ হয়ে যায় কেবল একটি মাস্টার্স ডিগ্রির লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে।

বিলম্বিত কর্মজীবন: পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সে পড়াশোনা শেষ করে যখন একজন তরুণ প্রথম চাকরির বাজারে পা রাখে, ততক্ষণে তার বুকের ভেতর জমছে পাহাড়সমান ক্লান্তি।

চরম মানসিক হতাশা: বছরের পর বছর শুধু মুখস্থ বিদ্যা আর পরীক্ষার বৈতরণী পার হয়ে যখন ‘সোনার হরিণ’ চাকরিটি মেলে না, তখন সেই তরুণের দীপ্ত চোখগুলো ম্লান হয়ে যায়। হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যায় তারুণ্যের সমস্ত আলো।

জমিজমা ও সঞ্চয় বিক্রি: শিক্ষাবাণিজ্যের নিষ্ঠুর থাবা:
উচ্চশিক্ষার এই তীব্র কৃত্রিম চাহিদাকে পুঁজি করে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে শিক্ষার এক ভয়ংকর বাণিজ্য সাম্রাজ্য। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সীমিত আসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে বাধ্য হয়েই অভিভাবকরা ঝুঁকছেন ব্যয়বহুল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বা নানা চটকদার প্রতিষ্ঠানের দিকে।

একটি তথাকথিত ডিগ্রির পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক বাবা-মা আজ নিঃস্ব: তিলে তিলে গড়া জীবনের কষ্টার্জিত জমানো সঞ্চয় এক নিমেষে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পৈতৃক ভিটেমাটি ও আদরের জমিটুকুও জলের দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে চিরতরে আটকা পড়ছেন ঋণের জালে।

বাস্তবতার নির্মম সত্য: জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে সন্তানকে যে ডিগ্রি কিনে দেওয়া হচ্ছে, দিনশেষে তা দিয়ে একটি সাধারণ চাকরির নিশ্চয়তাও মিলছে না। ডিগ্রিধারী বেকারের মিছিলে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি দীর্ঘশ্বাস।

কাগজের সনদ নাকি রক্তমাংসের দক্ষতা?
আজকের পৃথিবী আমূল বদলে গেছে। আধুনিক কর্মবাজার আর কেবল গাণিতিক জিপিএ-৫ বা ঝকঝকে মাস্টার্সের সনদ দেখে কাউকে বুকে টেনে নেয় না; নিয়োগকর্তারা আজ খোঁজেন বাস্তব ‘দক্ষতা’ (Skill)।

ডিগ্রি আছে, কাজ নেই: প্রতিবছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের করলেও কাজের বাজারে তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি, ডিজিটাল বা ব্যবহারিক দক্ষতা থাকছে না।

ভুল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: সমাজে আজও এক অদ্ভুত বৈষম্য গেঁথে আছে—কারিগরি বা হাতে-কলমে কাজকে ছোট করে দেখা হয়। অথচ একজন অদক্ষ সাধারণ গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান বা ফ্রিল্যান্সার আজ অনেক বেশি স্বাবলম্বী।

সংকট থেকে উত্তরণের পথ

অভিভাবকদের এই নিঃস্ব হওয়ার চক্র থেকে বাঁচাতে এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হলে আমাদের চিন্তাভাবনায় আমূল ও সাহসী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। মাস্টার্স বা বিএ পাস করাই সফলতার একমাত্র ও শেষ মাপকাঠি হতে পারে না—এই সত্যটা অভিভাবকদের মানতে হবে। এসএসসি বা এইচএসসির পর থেকেই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনে উৎসাহ দিতে হবে। পাঠ্যক্রমকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।

বাবার রক্তপানি করা উপার্জনে কেনা কাগজের ডিগ্রি যদি দিনশেষে বেকারত্বের অভিশাপ আর হতাশা ছাড়া আর কিছু উপহার না দেয়, তবে সেই শিক্ষা অভিশাপ ছাড়া কিছু নয়। সময় এসেছে সনদের এই অন্ধ মোহ চিরতরে ত্যাগ করার। সন্তানের হাতে কেবল এক টুকরো কাগজ তুলে না দিয়ে, তাদের সত্যিকারের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের প্রতিটি পরিবার ও সমাজের মূল অঙ্গীকার।