০২:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গ্যাস সংকটে ব্যাহত শিল্প উৎপাদন, দুর্ভোগে সাধারণ গ্রাহকরাও

The gallery was not found!

এলএনজি টার্মিনালে সৃষ্ট কারিগরি ত্রুটির প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে দেশের অন্যতম শিল্পনগরী গাজীপুরে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এখানকার কারখানাগুলোতে পণ্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়িতে গ্যাস নিতে না পারায় ভোগান্তিতে পড়ছেন বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চালক।

এদিকে, আবাসিক এলাকাতেও গ্যাস না থাকায় বিভিন্ন হোটেল থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হচ্ছে অনেক গ্রাহককে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, মাওনা, রাজেন্দ্রপুর ও কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানাগুলোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানায় বয়লার সচল রাখতে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ পিএসআই গ্যাস প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই। ফলে উৎপাদন লাইন বারবার থেমে যাচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

তিতাস গ্যাস সূত্র জানায়, টঙ্গী, জয়দেবপুর, চন্দ্রা, মাওনা ও কালীগঞ্জ অঞ্চল মিলিয়ে গাজীপুরে প্রতিদিন প্রায় ৫৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে মাত্র ৩৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার প্রায় ২ হাজার ৭৬৪টি শিল্পকারখানায়।

গ্যাসের সংকট শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। মাওনা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই অটোরিকশাচালকদের দীর্ঘ সারি। অনেক চালক দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহ করতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন।

মাওনা-গাজীপুর সড়কে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক জসিম বলেন, “গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে ট্রিপ কমে গেছে, আয়ও অনেক কমে গেছে।”

একই চিত্র গাজীপুর সদর উপজেলার কেআরসিসি ফিলিং স্টেশনেও। স্টেশনটির এক কর্মী জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকট চলছে। গত দুইদিন ধরে একেবারেই গ্যাস সরবরাহ নেই। এর আগে কয়েক দিন খুব কম চাপের গ্যাস দিয়ে কোনো রকমে স্টেশন চালানো হয়েছে।

আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও কম নয়। শ্রীপুর উপজেলার টেপিরবাড়ী এলাকার স্কুলশিক্ষিকা ঝরনা আক্তার বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে বাসায় গ্যাসের চাপ খুব কম। ঠিকমতো রান্না করা যাচ্ছে না। অনেক সময় বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।”

মৌচাক এলাকার সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা জানান, মাসের শুরুতে তাদের কারখানায় ১০ পিএসআই চাপের গ্যাস সরবরাহ থাকলেও গত কয়েকদিন ধরে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে কখনো ১.৫ পিএসআই, আবার কখনো ২ পিএসআই চাপের গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে কারখানার মেশিন সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ইটাহাটা এলাকার ইয়ন নিট কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হাসান জানান, কয়েক মাস ধরেই তারা বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। এরই মধ্যে নতুন করে গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

তিনি জানান, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা শ্রমিকদের কর্মহীন বসে থাকতে হচ্ছে। এতে কারখানার উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। সময়মতো ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দ্রুত এ সংকটের সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, “গাজীপুরে কত গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে বা কত ঘাটতি-এসব তথ্য অফিস থেকে নিতে হবে। আমার কাছে এ মুহূর্তে তথ্য নেই।”

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর
Business Times24

গ্যাস সংকটে ব্যাহত শিল্প উৎপাদন, দুর্ভোগে সাধারণ গ্রাহকরাও

Update Time : ১১:৪৬:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬

এলএনজি টার্মিনালে সৃষ্ট কারিগরি ত্রুটির প্রভাব এবার স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে দেশের অন্যতম শিল্পনগরী গাজীপুরে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এখানকার কারখানাগুলোতে পণ্য উৎপাদন কার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়িতে গ্যাস নিতে না পারায় ভোগান্তিতে পড়ছেন বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের চালক।

এদিকে, আবাসিক এলাকাতেও গ্যাস না থাকায় বিভিন্ন হোটেল থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হচ্ছে অনেক গ্রাহককে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এর নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, মাওনা, রাজেন্দ্রপুর ও কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানাগুলোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক কারখানায় বয়লার সচল রাখতে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ পিএসআই গ্যাস প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই। ফলে উৎপাদন লাইন বারবার থেমে যাচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি আদেশ সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

তিতাস গ্যাস সূত্র জানায়, টঙ্গী, জয়দেবপুর, চন্দ্রা, মাওনা ও কালীগঞ্জ অঞ্চল মিলিয়ে গাজীপুরে প্রতিদিন প্রায় ৫৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে গড়ে মাত্র ৩৬০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলার প্রায় ২ হাজার ৭৬৪টি শিল্পকারখানায়।

গ্যাসের সংকট শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। মাওনা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই অটোরিকশাচালকদের দীর্ঘ সারি। অনেক চালক দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহ করতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন।

মাওনা-গাজীপুর সড়কে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক জসিম বলেন, “গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে ট্রিপ কমে গেছে, আয়ও অনেক কমে গেছে।”

একই চিত্র গাজীপুর সদর উপজেলার কেআরসিসি ফিলিং স্টেশনেও। স্টেশনটির এক কর্মী জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকট চলছে। গত দুইদিন ধরে একেবারেই গ্যাস সরবরাহ নেই। এর আগে কয়েক দিন খুব কম চাপের গ্যাস দিয়ে কোনো রকমে স্টেশন চালানো হয়েছে।

আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও কম নয়। শ্রীপুর উপজেলার টেপিরবাড়ী এলাকার স্কুলশিক্ষিকা ঝরনা আক্তার বলেন, “গত কয়েকদিন ধরে বাসায় গ্যাসের চাপ খুব কম। ঠিকমতো রান্না করা যাচ্ছে না। অনেক সময় বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।”

মৌচাক এলাকার সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা জানান, মাসের শুরুতে তাদের কারখানায় ১০ পিএসআই চাপের গ্যাস সরবরাহ থাকলেও গত কয়েকদিন ধরে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে কখনো ১.৫ পিএসআই, আবার কখনো ২ পিএসআই চাপের গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে কারখানার মেশিন সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ইটাহাটা এলাকার ইয়ন নিট কম্পোজিট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ হাসান জানান, কয়েক মাস ধরেই তারা বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। এরই মধ্যে নতুন করে গ্যাস সংকট দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

তিনি জানান, গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা শ্রমিকদের কর্মহীন বসে থাকতে হচ্ছে। এতে কারখানার উৎপাদন প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। সময়মতো ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে দ্রুত এ সংকটের সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, “গাজীপুরে কত গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে বা কত ঘাটতি-এসব তথ্য অফিস থেকে নিতে হবে। আমার কাছে এ মুহূর্তে তথ্য নেই।”