ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই ঋণের সুরক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদায় নিশ্চিত করা। বাস্তবতা হলো-একটি ঋণ ভালো না হলে শেষ আশ্রয় হয় আদালত। আর সেই আদালতে জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয় ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ (CAD)। একটি দক্ষ ও সেন্ট্রালাইজড ক্রেডিট অ্যাডমিন ব্যবস্থা ব্যাংককে মামলায় শক্ত অবস্থানে দাঁড় করায় এবং জয়ের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মূলত এমন একটি ফাংশন, যা ঋণ অনুমোদনের আগেই সব ধরনের ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করে এবং নিশ্চিত করে যে ভবিষ্যতে এগুলো আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে দাঁড়াতে পারে। সঠিক ডকুমেন্টেশনই হলো মামলায় জেতার প্রধান অস্ত্র। একটি ছোট ত্রুটিও ব্যাংকের বিরুদ্ধে যেতে পারে, ফলে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরও ঋণ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতা থাকায় এই ঝুঁকি আরও বেশি। অস্পষ্ট মালিকানা, ভুয়া কাগজপত্র বা অসম্পূর্ণ ডকুমেন্ট-এসব কারণে অনেক সময় ব্যাংক আদালতে দুর্বল হয়ে পড়ে। এখানেই ক্রেডিট অ্যাডমিনের গুরুত্ব। তারা জামানতের সত্যতা যাচাই, দলিলের সঠিকতা নিশ্চিত এবং আইনি কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডকুমেন্ট প্রস্তুত করে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ফাঁক না থাকে।
শুধু ডকুমেন্টেশন নয়, সিকিউরিটি সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন ও নিয়মিত পরিদর্শনও মামলায় জেতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ আদালতে শুধু কাগজ নয়, বাস্তব সম্পদের অস্তিত্ব ও মূল্যও প্রমাণ করতে হয়। এই কাজগুলো দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করে ক্রেডিট অ্যাডমিন দল।
ঋণ বিতরণের পরেও এই বিভাগের দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তখনই শুরু হয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ-ডকুমেন্ট সংরক্ষণ, নিয়মিত আপডেট, রিনিউয়াল নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে আইনি বিভাগকে সহায়তা দেওয়া। অনেক সময় দেখা যায়, পুরনো বা অসম্পূর্ণ ডকুমেন্টের কারণে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। একটি শক্তিশালী ক্রেডিট অ্যাডমিন এই ঝুঁকি কমিয়ে আনে এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সঠিকভাবে প্রস্তুত রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে সেন্ট্রালাইজড ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিশেষভাবে কার্যকর। এক জায়গা থেকে সব ডকুমেন্ট ও তথ্য সংরক্ষণ এবং তদারকি করার ফলে কোনো ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত ও সংশোধন করা যায়। অডিট, কমপ্লায়েন্স এবং আইনি প্রস্তুতিও সহজ হয়। ফলে আদালতে উপস্থাপনের সময় ব্যাংক একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল ডকুমেন্টেশন শুধু ঋণ ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং মামলায় পরাজয়ের ঝুঁকিও বাড়ায়। অন্যদিকে শক্তিশালী ক্রেডিট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ব্যাংকের পক্ষে একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। এতে মামলা খরচ কমে, সময় বাঁচে এবং দ্রুত ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সবশেষে বলা যায়, মামলায় জেতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়-এটি একটি সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার ফল। আর সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শক্তিশালী ক্রেডিট অ্যাডমিন। ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আইনি লড়াইয়ে সফল হতে এই বিভাগের বিকল্প নেই।
লেখক: কাজী মাহমুদুর রহমান
চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও),ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি

-কাজী মাহমুদুর রহমান, সিএলও 
























