বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধবিমানের তুলনায় এতে নিরাপত্তাসম্পর্কিত ফিচার অনেক কম। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও অন্যান্য যুদ্ধবিমানের চেয়ে বেশি।
নিউজ ডেস্ক
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
ঢাকায় বিধ্বস্ত হওয়া যুদ্ধবিমানটি সংস্করণের দিক থেকে খুব বেশি পুরনো না হলেও প্রযুক্তির দিক থেকে বেশ পিছিয়ে ছিল বলে মনে করছেন সামরিক খাতের বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, আধুনিক যুদ্ধবিমানের তুলনায় এতে নিরাপত্তাসম্পর্কিত ফিচার অনেক কম। ফলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও অন্যান্য যুদ্ধবিমানের চেয়ে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের বরাতে এভিয়েশন খাতের সংবাদমাধ্যম ‘অ্যারোস্পেস গ্লোবাল নিউজ’ (এজিএন) বলছে, এফ-সেভেনের মূল কাঠামোটাই বেশ পুরনো। এতে ‘ফ্লাই-বাই-ওয়্যার’ (এফবিডাব্লিউ) ব্যবস্থা নেই।
এ ধরনের ব্যবস্থায় পাইলটের দেওয়া নির্দেশনা বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত হয় এবং সে অনুযায়ী বিমানের বিভিন্ন অংশ পরিচালিত হয়।
বিশ্বে এফ-সেভেনের ব্যবহার কমে যাওয়ার পেছনে নিরাপত্তাসংক্রান্ত আরো কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছে এজিএন।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, ১৯৬৬ থেকে শুরু করে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দুই হাজার ৪০০টির বেশি এফ-সেভেন বানিয়েছে চীন। তাদের এসব উড়োজাহাজ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশ প্রশ্নও তুলেছে।
বলা হচ্ছে, নির্দেশিকাটি ভাষান্তর করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়; বিভ্রান্তিও তৈরি হয় নানাভাবে। আর এসব প্রতিবন্ধকতার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এর রক্ষণাবেক্ষণে।
এছাড়া এর নকশায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও কোনো সময়সূচি মানা হয় না। হঠাৎ করে পরিবর্তন আনার কারণে অনেক সময়ই প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না।
মিয়ানমারের বিমানবাহিনী এর আগে উড়োজাহাজটির স্থলভাগে আঘাত হানার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এজিএন বলছে, ঢাকায় বিধ্বস্ত হওয়া ‘এফ-সেভেন বিজিআই’ এই সিরিজের আধুনিক সংস্করণের হলেও সেটি তৃতীয় প্রজন্মের যুদ্ধবিমান।
বিমান চালানো, শত্রুকে ফাঁকি দেওয়া কিংবা হামলা চালানোর যে সক্ষমতা চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলোয় রয়েছে, তা এফ-সেভেনে নেই।
সামরিক খাতের যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানি ‘জেইনস ইনফরমেশন গ্রুপের’ বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ‘এফ-সেভেন’ উড়োজাহাজটি এখন প্রশিক্ষণেই বেশি ব্যবহার করা হয়; যুদ্ধক্ষেত্রে খুব একটা প্রয়োগ দেখা যায় না।
কোম্পানিটি বলছে, চীন ১৯৬৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ‘জে-সেভেন’ নামে এ যুদ্ধবিমান বানায়, যেটি রপ্তানির ক্ষেত্রে নাম হয় ‘এফ-সেভেন’। তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশ এ যুদ্ধবিমান বেশি ব্যবহার করে থাকে।
রয়টার্স বলছে, ২০২৩ সালের শেষ দিকে এসে চীনের সামরিক বাহিনী থেকে ‘জে-সেভেন’ পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, মিশর, ইরান ও উত্তর কোরিয়া এখনো এ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে।
প্রতিরক্ষা খাতের যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান— ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস (আইআইএসএস) বলছে, এসব দেশের মধ্যে পাকিস্তানের হাতে এ যুদ্ধবিমান রয়েছে সবচেয়ে বেশি; ৬৬টি।
আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর বলছে, উত্তরায় বিধ্বস্ত হওয়ার আগে যুদ্ধবিমানটি ঢাকার একে খন্দকার বিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে। উড্ডয়নের ১২ মিনিটের মাথায় ‘যান্ত্রিক ত্রুটির’ কারণে সেটি বিধ্বস্ত হয়। এতে নিহত হয় অন্তত ২৮ জন।
তবে কী ধরনের ত্রুটি ছিল, সেটা এখনও ব্যাখ্যা করা হয়নি। বিস্তারিত জানতে সবাইকে ‘ধৈর্য’ ধরার অনুরোধ জানিয়েছেন বিমান বাহিনীর প্রধান মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।
মঙ্গলবার দেশবাসীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, “আমি এ মুহূর্তে দেশে ইউনিফর্ম পরা মোস্ট সিনিয়র এয়ারম্যান। তারপরও আমার নিজস্ব কোনো ধারণা এখন বলা উচিত হবে না।
“তবে, অবশ্যই এটা একটা সিঙ্গেল ইঞ্জিন বিমান। আমাদের এই ইঞ্জিনের অনেক টেকনিক্যাল প্রবলেম হতে পারে, পাখির আঘাত হতে পারে, অন্য কিছু হতে পারে। অনেক কিছু বলতে পারতাম, যদি বিমানটা অক্ষত থাকত অথবা পাইলট আমাদের সঙ্গে থাকত। কিন্তু একটাও নাই আমাদের কাছে।”
তিনি বলেন, “এটা তদন্ত করতে একটু সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আপনাদের ধৈর্য ধরতে হবে।”

এফ-সেভেনকে ‘চেংদু জে-সেভেন’ মডেলের সবচেয়ে আধুনিক সংস্করণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
উড়োজাহাজটি তৈরি করেছে চীনের ‘চেংদু এয়ারক্রাফট করপোরেশন’। এটি মূলত সোভিয়েত আমলের মিগ-টোয়েন্টিওয়ানের উন্নত চীনা সংস্করণ। ‘মিগ-টোয়েন্টিওয়ান’ এক সময় বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আরএএনডির’ ইউরোপীয় শাখার প্রতিরক্ষা কৌশল, নীতি ও সক্ষমতা বিষয়ক প্রধান গবেষক জ্যাকব প্যারাকিলাস বলেন, “এটি পুরনো মডেলের একটি বিমানের তুলনামূলক আধুনিক সংস্করণ।”
মার্কিন সাময়িকী নিউজউইককে তিনি বলেন, “এফ-সেভেন বানানো হয়েছে মূলত প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর জন্য। তার মানে হল, এটি খুবই দ্রুত গতিতে উড়তে সক্ষম।”
তিনি বলেন, “বড় পাখাযুক্ত অন্যান্য বিমানের তুলনায় এটির উড্ডয়ন ও অবতরণ কিছুটা কঠিন। তারপরও পুরনো একটি মডেল হিসেবে যুদ্ধবিমানটি খুব একটা অনিরাপদ নয়।”

নিজস্ব প্রতিবেদক 
























