১২:৫২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল ইউরোপ, ফ্রান্স-জার্মানি-পোল্যান্ডে সংঘর্ষ ও ধরপাকড়

The gallery was not found!

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সংকোচন, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা এবং তরুণদের দাবি উপেক্ষার প্রতিবাদে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপ। গত শনিবার রাতে ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডে জেন-জি তরুণদের বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ফ্রান্সে পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জার্মানির বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালিতেও বিক্ষোভ করেছেন তরুণেরা।

হ্যালোইন উৎসবের রাতে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এই বিক্ষোভ নতুন করে মহাদেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার চিত্র সামনে এনেছে। তরুণদের অভিযোগ, সরকারগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ফ্রান্সে গ্রেপ্তার ৫৬৫ জন

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ অংশ নেন। বিভিন্ন শহর থেকে ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন চার পুলিশ সদস্য।

দিনের বেশির ভাগ সময় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্যারিসে মিছিলের শেষ পর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার উদ্যোগ নেয়। লিওঁ ও তুলুজে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মার্সেই শহরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রান্সে গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভ হলো। শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে প্রথমে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। পরে শ্রমিক সংগঠন ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকেরাও এতে যুক্ত হন।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত ছিল। বিক্ষোভকারী জেরোম রদ্রিগেজের অভিযোগ, সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক চাপে থাকলেও সরকার তাদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণমান নির্ধারণী সংস্থা ফিচের নেতিবাচক পূর্বাভাস সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।

জার্মানিতে লুটপাট ও পেট্রলবোমা

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন, হামবুর্গ ও কোলনসহ বিভিন্ন শহরে ১০ হাজারের বেশি তরুণ বিক্ষোভে অংশ নেন। ‘জেনজি রেগেল্ট!’ নামের একটি সংগঠন এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

দিনের বেলায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও সন্ধ্যার পর কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রাঙ্কফুর্টে মুখোশধারী ব্যক্তিরা বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর, আতশবাজি ও পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।

হামবুর্গ ও কোলনেও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ। বনে সংঘর্ষে একজন পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক বলেন, ফ্রাঙ্কফুর্টের বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত বামপন্থী উগ্রবাদী অনুপ্রবেশ করেছিলেন।

বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘প্রতিরোধের সময় এখন’ এবং ‘মের্ৎসকে বিদায় নিতে হবে’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ জানান।

পোল্যান্ডেও রাজনৈতিক উত্তেজনা

পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি সেনেগাল সফরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর মাঝপথ থেকে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

এদিকে ইতালিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তরুণদের অংশগ্রহণের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই অসন্তোষের অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারগুলোকে এখন তরুণদের দাবির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জনপ্রিয় খবর

জনতা ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক অগ্রযাত্রা, নয় মাসে আয় বেড়ে ১.৩৬ টাকা

Business Times24

জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল ইউরোপ, ফ্রান্স-জার্মানি-পোল্যান্ডে সংঘর্ষ ও ধরপাকড়

Update Time : ১১:০৯:১১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সংকোচন, শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা এবং তরুণদের দাবি উপেক্ষার প্রতিবাদে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে ইউরোপ। গত শনিবার রাতে ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডে জেন-জি তরুণদের বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ফ্রান্সে পাঁচ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জার্মানির বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালিতেও বিক্ষোভ করেছেন তরুণেরা।

হ্যালোইন উৎসবের রাতে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এই বিক্ষোভ নতুন করে মহাদেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার চিত্র সামনে এনেছে। তরুণদের অভিযোগ, সরকারগুলো জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ফ্রান্সে গ্রেপ্তার ৫৬৫ জন

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ অংশ নেন। বিভিন্ন শহর থেকে ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন চার পুলিশ সদস্য।

দিনের বেশির ভাগ সময় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্যারিসে মিছিলের শেষ পর্যায়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার উদ্যোগ নেয়। লিওঁ ও তুলুজে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। মার্সেই শহরেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

ফ্রান্সে গত ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বিক্ষোভ হলো। শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি ব্যয় কমানোর নীতির বিরুদ্ধে প্রথমে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। পরে শ্রমিক সংগঠন ও ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমর্থকেরাও এতে যুক্ত হন।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত ছিল। বিক্ষোভকারী জেরোম রদ্রিগেজের অভিযোগ, সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক চাপে থাকলেও সরকার তাদের সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না।

ফ্রান্সের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশে পৌঁছেছে। ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণমান নির্ধারণী সংস্থা ফিচের নেতিবাচক পূর্বাভাস সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।

জার্মানিতে লুটপাট ও পেট্রলবোমা

জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, বার্লিন, হামবুর্গ ও কোলনসহ বিভিন্ন শহরে ১০ হাজারের বেশি তরুণ বিক্ষোভে অংশ নেন। ‘জেনজি রেগেল্ট!’ নামের একটি সংগঠন এই কর্মসূচির আয়োজন করে।

দিনের বেলায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও সন্ধ্যার পর কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রাঙ্কফুর্টে মুখোশধারী ব্যক্তিরা বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর, আতশবাজি ও পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন।

হামবুর্গ ও কোলনেও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ। বনে সংঘর্ষে একজন পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন। হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক বলেন, ফ্রাঙ্কফুর্টের বিক্ষোভে প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত বামপন্থী উগ্রবাদী অনুপ্রবেশ করেছিলেন।

বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘প্রতিরোধের সময় এখন’ এবং ‘মের্ৎসকে বিদায় নিতে হবে’ লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদ জানান।

পোল্যান্ডেও রাজনৈতিক উত্তেজনা

পোল্যান্ডে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি সেনেগাল সফরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর মাঝপথ থেকে উড়োজাহাজ ঘুরিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

এদিকে ইতালিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। সব মিলিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তরুণদের অংশগ্রহণের অভাব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই অসন্তোষের অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারগুলোকে এখন তরুণদের দাবির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।